দেশের স্বার্থেই সাপ্তাহিক ছুটি একদিন করা হোক  


মুশফিকুর রহমান
সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের আমলে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের দেশে সাপ্তাহিক ছুটি রোববারের পরিবর্তে শুক্রবার করা হয়। অনেকেই মনে করেন শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা আসলে ধর্মের কোন বিষয় নয়। সাধারণ জনগনের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটাই ছিল আসল উদেশ্য। আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় কোটি কোটি শ্রম ঘন্টা অপচয় হচ্ছে। আর রোববার হলো আন্তর্জাতিক ছুটি। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে রোববারই সাপ্তাহিক ছুটি। শুক্র ও শনিবার ছুটির কারণে বর্হিবিশ্ব থেকে তিনদিন বিচ্ছিন্ন থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। 
বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের জন্য ১৯৯৬ সালে তৎকালিন সরকার সাপ্তাহিক ছুটি এক দিনের পরিবর্তে দু‘দিন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মূলত তখন থেকে সাপ্তাহে একদিনের জায়গায় দ’ুদিন ছুটি উপভোগ করে আসছে দেশবাসি। কিন্তু এখন দেশে যথেষ্ট পরিমান বিদ্যুত্ উৎ্পাদন হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি নেই, লোড শেডিংও নেই। এ অবস্থায় সাপ্তাহিক ছুটি দু’দিন বহাল রাখার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না। সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে দেশের আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সপ্তাহে দু'দিন ছুটি থাকলে তা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে অনেকাংশে স্থবির করে দেয়। দু'দিন সাপ্তাহিক ছুটি ও রোববার আন্তর্জাতিক ছুটির কারণে বর্হিবিশ্বের সাথে আমদানি-রফতানি ও ব্যবসা বাণিজ্যেও ব্যাঘাত ঘটছে প্রতিনিয়ত। ফলে অন্য দেশের সাথে ব্যবসায়িদের কাজকর্মে  বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি  রবিবার, আর আমাদের দেশে সাপ্তাহিক ছুটি  শুক্র ও শনিবার। এ অবস্থায় বর্হিবিশ্বের সাথে ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সপ্তাহে তিনদিন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সাপ্তাহিক ছুটি দু‘দিনের পরিবর্তে একদিন করা হলে কাজের গতি আরও বাড়বে এবং কোটি কোটি শ্রম ঘন্টার সাশ্রয় হবে।
আশির দশকে এরশাদ সরকার সৌদি আরব আর পাকিস্তান সরকারকে খুশি রাখতে রোববারের পরিবর্তে শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি ষোষনা করে। অথচ ১৯৯০ সালে নওয়াজ শরীফ ক্ষমতায় এসেই পাকিস্তানে শুক্রবারের পরিবর্তে রোববারকে সাপ্তাহিক ছুটি হিসাবে বেছে নেয়। এরশাদ সরকার সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী এনে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম  হিসাবে ঘোষণা করে। দেশকে ইসলামিকরণ করতে কোন কিছুই  বাকি রাখেনি তিনি। ১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর শুক্রবারের সাথে ও শনিবারকেও সাপ্তাহিক ছুটি ষোষণা করে।মূলত বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের জন্য তখন সাপ্তাহিক ছুটি দু'দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন দেশে যথেষ্ট বিদ্যুত্ উৎ্পাদন হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুতের কোনও ঘাটতি নেই। তাছাড়া রুপপুরে দু‘হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ দ্রæত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ অবস্থায় বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের জন্য সাপ্তাহিক ছুটি দু'দিন বহাল রাখার কোনো যুক্তি নেই। সপ্তাহে দু’দিন হিসাবে ছুটির হিসাব গননা করলে দেখা যায়, বৎসরে মোট ছুটি দাঁড়ায় প্রায় ১০৪ দিন। সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বছওে সাড়ে তিন মাস বন্ধ থাকে তাহলে কাজকর্মে গতিশীলতা আসবে কিভাবে? তাছাড়া বিভিন্ন দিবসের ছুটি হিসেব করলে তা আরও এক মাসের মতো বাড়বে।
শুধু যে অমুসলিম দেশগুলোতে সাপ্তাহিক ছুটি রোববার তা নয়,  বিশ্বের  অনেক মুসলিম দেশে সাপ্তাহিক ছুটি রোববার তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, আলবেনিয়া, আজারবাইজান, বেনিন, ব্রুনেই,  লেবানন,  মরক্কো, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, তাঞ্জানিয়া, তিউনিশিয়া, জাম্বিয়াতে সাপ্তাহিক ছুটি রোববার। 
শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি এবং রোববার আন্তর্জাতিক ছুটির কারণে দেশের ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করছে। তিন দিনের ছুটির কারণে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিরুপ প্রভাব লক্ষ করা যায়। তৈরী পোষাক ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় অর্ডার বাতিল হওয়ার আশংকা থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আগামী ২০২৪ সালে  চ’ড়ান্ত ভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যদা অর্জন করবে। এই অর্জন বাংলাদেশকে আরও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হতে উদ্ধুদ্ধ করবে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থায় আমাদেরকে আবেগের জায়গা থেকে সরে আসতে হবে। শুধু তাই নয় মেধা, যোগ্যতা, কর্মমুখি ধ্যাণজ্ঞান আয়ত্ব করতে হবে। দিবস আর ছুটির গ্যাড়াকল থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটি দু-দিনের পরিবর্তে একদিনে আনতে পারলে কাজের গতি বহুগুনে বেড়ে যাবে বলে ব্যবসায়িরা অনেকে মনে করেন। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির কারণে আর রবিবার আন্তর্জাতিক ছুটির করণে তিন দিন পুরোবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই অবস্থায় তিন দিনের ছুটির করণে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি। তাছাড়া বর্তমানে সরকারি চাকুরদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা শতগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৈশাখি ভাতা, বাবুর্চি বিল, মোবাইল কেনার টাকা, পেনসন সুবিধাসহ আরও নতুন নতুন অনেক সুযোগ যোগ হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবিদের কল্যাণে। সরকারি চাকুরদের এতকিছুর দেয়ার পরও শনিবারকে সাপ্তাহিক ছুটি রাখার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। দেশের ব্যবসা বানিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির স্বার্থে সাপ্তাহিক ছুটি দু‘দিনের পরিবর্তে একদিন করতে পারলে অতিরিক্ত শ্রমঘন্টা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। সহস্রাব্দ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের গতিশীলতা আরো বেগবান হবে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মানসহ যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে সারা দেশে সরকার উন্নয়নের যে ধারা সূচনা করেছে তা আরো গতিশীল হবে।
সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

Comments

comments