ব্রেকিং নিউজ

প্রতিরক্ষাসহ ৩৬ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর, তিস্তার পানির হিস্যা না দিয়ে বিকল্প প্রস্তাব ভারতের

হাসিনা
দ্য বিডি এক্সপ্রেস ডেস্ক:
নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে মোট ৩৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার জন্য চারটি সমঝোতা হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল দুপুরে হায়দরাবাদ হাউসে বৈঠকে বসেন সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই নেতা নিজেদের মধ্যে একান্ত বৈঠকের পর সংশ্লিষ্ট নেতা ও কর্মকর্তাদের নিয়ে শীর্ষ বৈঠক করেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রূপরেখা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক। কৌশলগত ও ব্যবহারিক শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকার মিরপুরের ডিফেন্স সার্ভিস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ ও ভারতের তামিলনাড়– রাজ্যের ওয়েলিংটনে (নিলগিরি) ডিফেন্স সার্ভিস স্টাফ কলেজের মধ্যে সমঝোতা স্মারক। জাতীয় নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও কৌশলগত শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ও নয়া দিল্লির ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের মধ্যে সমঝোতা স্মারক। প্রতিরক্ষা খাতের এই তিন সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব সই করেন। মহাকাশের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ও ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (আইএসআরও) চেয়ারম্যান। আনবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব এবং ভারতের আণবিক শক্তি বিভাগের সচিব। পরমাণু নিরাপত্তা ও বিকিরণ নিয়ন্ত্রণে কারিগরি তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অথরিটি (বিএইআরএ) ও ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি বোর্ডের (এইআরবি) মধ্যে বন্দোবস্তনামায় দুই সংস্থার চেয়ারম্যান সই করেন। বাংলাদেশে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিএইআরসি) ও ভারতের গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপের (জিসিএনইপি) মধ্যে চুক্তিতে দুই সংস্থার চেয়ারম্যান সই করেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকসের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং ভারতের ইলেক্ট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা হয়।সাইবার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিজিডি ই-জিওভি সিআইআরটি) ও ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের (সিইআরটি-ইন) মধ্যেও চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব ও ভারতের ইলেক্ট্রনিকস ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব এ দুটিতে সই করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তজুড়ে বর্ডার হাট স্থাপনের বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করেন দুই দেশের বাণিজ্য সচিব। বিচারিক ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সই করেন। ভারতে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা তৈরির কর্মসূচির বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও ভারতের ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির (এনজেএ) পরিচালক সই করেন। নৌ-বিদ্যায় সহায়তার বিষয়ে সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের নৌপরিবহন বিভাগের সচিব ও ভারতের লাইটহাউস অ্যান্ড লাইটশিপসের মহাপরিচালক (ডিজিএলএল) সই করেন। ভূবিদ্যা নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাশের (জিএসবি) মহাপরিচালক ও জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (জিএসআই) উপ-মহাপরিচালক সই করেন। কোস্টাল ও প্রটোকল রুটে যাত্রী ও পর্যটন সেবায় দুই দেশের সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিনিময় করা হয়। ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুটে সিরাজগঞ্জ থেকে লালমনিরহাটের দইখাওয়া এবং আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত নাব্য চ্যানেলের উন্নয়নে সমঝোতা স্মারক। এ সমঝোতা স্মারক দুটিতে সই করেন দুই দেশের নৌ-সচিব। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ও ভারতের তথ্য সচিব স্বাক্ষর করেন। অডিও-ভিজ্যুয়াল সহপ্রযোজনা চুক্তিতেও তারা দুজন সই করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ সহায়তা সমঝোতা স্মারকে সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সই করেন। মোটরযান যাত্রী চলাচল (খুলনা-কলকাতা রুট) নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তি ও চুক্তির স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরসে দুই দেশে সড়ক বিভাগের সচিব স্বাক্ষর করেন। তৃতীয় ঋণ সহায়তার আওতায় বাংলাদেশকে সাড়ে ৪০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা স্মারকটিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সই করেন। বাংলাদেশে ৩৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণে অর্থায়নের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার সই করেন। বিচার বিভাগের সহযোগিতা, সাড়ে চারশ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা, মহাকাশ গবেষণা এবং যাত্রীবাহী নৌচলাচলে স্বাক্ষরিত সমঝোতাপত্রগুলো অনুষ্ঠানে বিনিময় হয়।

তিস্তার বিকল্প প্রস্তাব মমতার

তিস্তায় পানি নেই দাবি করে বাংলাদেশের সমস্যা মেটাতে তোর্সা ও জলঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল নয়াদিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি এ প্রস্তাব দেন। বৈঠক শেষে মমতা তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের বাড়ির লনে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করেন।
সূত্র জানায়, গতকাল সকালে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের একপর্যায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই মোদি তিস্তার পানিবণ্টনের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তার সমস্যা তিনি বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে বুঝিয়ে বলেছেন। এ সময় তিনি দাবি করেন, তিস্তায় কোনো পানি নেই। পানির অভাবে এনটিপিসির বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। সেচের জন্য পানি মিলছে না।
মমতা আরও বলেন, উত্তরবঙ্গে তোর্সা ও জলঢাকাসহ চারটি নদী আছে। সেখানে পানি আছে। ফলে তিস্তার বিকল্প হিসেবে এই চারটি নদীর পানি ব্যবহার করা যেতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কলকাতা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বলেছেন, কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর নামে ভবন হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ার হতে পারে। তাদের আলোচনায় দুই বাংলায় দুদিন পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সন্ধ্যায় ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারীর সঙ্গে তার মৌলানা আজাদ অ্যাভিনিউয়ের বাসভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক হোটেল তাজে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। পররাষ্ট্র সচিব আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হামিদ আনসারীর সঙ্গে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী চারদিনের সরকারি সফরে গত শুক্রবার নয়াদিল্লি পৌঁছেন।

Comments

comments