ব্রেকিং নিউজ

গ্যাস সংকটে নাকাল দেশবাসি; জনদুর্ভোগ চরমে

gas1-thebdexpress

দ্য বিডি এক্সপ্রেস.কম।।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এসব অঞ্চলের বাসাবাড়িতে চুলা প্রায় বন্ধ। দিনের বেলা রান্না হচ্ছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নেই। সব মিলিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন সেবা।  শীতের সময় গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট গ্যাসের পাইপলাইনে জমাট বেঁধে যায়। এতে গ্যাস সঞ্চালনের গতি কমে যায়। এ ছাড়া শীতের সময় গ্যাসের ব্যবহারও বেশি হয়। ফলে শীত এলেই গ্যাসের কিছুটা সংকট দেখা দেয়। তবে এবারের সংকট অন্যবারের চেয়েও তীব্র হওয়ায় এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে ভিন্ন তথ্য। এবারের তীব্র গ্যাস সংকটের পেছনে শীতই একমাত্র দায়ী নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি এতই নাজুক হয়েছে যে ভোর থেকেই গ্যাস উধাও হয়ে যায়। আসতে আসতে লেগে যায় রাত ৮টা। কোথাও কোথাও রাত ১১টার আগে গ্যাস মেলে না। ফলে অনেক এলাকায় দৈনন্দিন রান্নার কাজ একেবারেই থেমে গেছে। কেউ কেউ খাবারের জন্য হোটেলে ছুটছে। রাজধানী ঢাকার প্রায় সব এলাকায় এ পরিস্থিতি। তবে সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি চট্টগ্রামে। সেখানে গভীর রাতেও গ্যাসের দেখা মিলছে না। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ বলছে, অসংখ্য অবৈধ সংযোগ রয়েছে শিল্প-কারখানায়। এর ফলে হিসাবের বাইরে গ্যাস চলে যাচ্ছে এসব শিল্প-কারখানায়। এ ছাড়া গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জের বাসাবাড়িতে হাজার হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। প্রতিদিনই তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব গ্যাসের লাইন দিচ্ছেন। এ কারণেও গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া  বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ গ্যাস লাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। কারণ এ পাইপলাইনে মাত্রাতিরিক্ত বালু ও কনডেনসেট জমেছে। এসবের পাশাপাশি গ্যাস ফুরিয়ে আসায় নির্বিঘ্ন গ্যাস সরবরাহব্যবস্থাও শঙ্কার মধ্যে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শীত শেষে পাইপলাইনে কনডেনসেট ও বালু কমে আসবে। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাসের মজুদ না থাকায় পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি ঘটবে না। সে ক্ষেত্রে এখনি পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প ভাবার পরামর্শ দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তাদের মতে, পাইপলাইনের গ্যাসের পরিবর্তে লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহারের ওপর এখন থেকেই জোর দিতে হবে। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নানা কারণে গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে মূল কারণ গ্যাসের মজুদ কমছে। দ্রুত পাইপ লাইনের গ্যাসের বিকল্প ভাবতে হবে। এ জন্য আমরা এলপিজি গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহ বাড়াতে পরিকল্পনা নিয়েছি। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে এলপিজি ব্যবহারের আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে।’ জানা গেছে, বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ গ্যাস পাইপলাইনে বালু ও কনডেনসেটের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছিল। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য গ্যাস ট্রান্সমিশন কম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) পাইপলাইন পরিষ্কারের উদ্যোগ নেয়। পাইপলাইন সংস্কারের কাজ এখন শেষের পর্যায়। আজ মঙ্গলবার এটি চালু হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। এ বিষয়ে গতকাল তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী আলী আশরাফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডাস্ট (ময়লা) জমে যাওয়ায় বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ পাইপলাইনে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আগামীকাল (মঙ্গলবার) এটি ফের চালু হতে পারে। এটি চালু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমান গ্যাসের যে মজুদ আছে তা ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে। এ জন্য এখনই পাইপলাইনের বিকল্প গ্যাসের কথা ভাবতে হবে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন করছে। এখান থেকে প্রতিদিন বিদেশ থেকে আমদানি করা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। ২০১৭ সালের শুরুতেই এ টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া সাগরের ১০, ১১, ১২, ১৬, ১৮ ও ২১ নম্বর ব্লকে দরপত্র ছাড়াই বিদেশি কম্পানিকে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে আট ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের একটি আধার চিহ্নিত হয়েছে। তবে এসব ব্লকে কূপ খনন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে স্থলভাগে গ্যাস আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এ কারণে সরকার এলপিজি ব্যবহারের ওপর সাধারণ মানুষকে জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অবৈধ সংযোগ সংকট বাড়িয়েছে : গত সাত বছরে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। কিন্তু হিসাবের বাইরে থাকা অবৈধ সংযোগগুলোই পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে। বর্তমানে ৩২০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ২৭৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে জাতীয় গ্রিডে। সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে বিদ্যুতে দেওয়া হয়েছে ১০০ কোটি ও সার কারখানায় ২৩ কোটি ঘনফুট। তবে অবৈধ শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়ির অবৈধ সংযোগে কত গ্যাস যাচ্ছে সে হিসাব নেই কারো কাছে। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকাসহ তিতাসের গ্যাস বিতরণ অঞ্চলে অসংখ্য অবৈধ সংযোগ রয়েছে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় সবচেয়ে বেশি অবৈধ শিল্প সংযোগ রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগ দিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন তিতাসের কিছু কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনীতিকরা। জানা যায়, তিতাসের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিতাস গ্যাস বিতরণ এলাকায় ছয়জনের একটি সিন্ডিকেট অবৈধ সংযোগের নেপথ্যে রয়েছেন। তাঁরা হলেন তিতাস গ্যাস কম্পানির ভালুকা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান ঝন্টু, গাজীপুরের ব্যবস্থাপক আ ম সাইফুল ইসলাম, ফতুল্লার ব্যবস্থাপক শহিরুল, চন্দ্রার উপব্যবস্থাপক তোরাব আলী, সিবিএ নেতা ফারুক হাসান এবং তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী নওশাদুল ইসলাম। এই সিন্ডিকেটের অবৈধ কর্মকাণ্ড বের করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির একটি খসড়া প্রতিবেদনও প্রস্তুত হয়েছে। কালের কণ্ঠ’র নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের দাবিতে গতকাল সদর উপজেলার ফতুল্লা ভূইঘর এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুটে ঝাড়ু হাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী। ‘আমরা সাধারণ জনগণ’ ব্যানারে ‘গ্যাস নাই গ্যাস চাই, পাক করে খেতে চাই’ স্লোগানে কুতুবপুর ইউনিয়ন এলাকাবাসী এ কর্মসূচি পালন করে। এ সময় সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। পরে ফতুল্লা থানার পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকাবাসী জানায়, রাত ১২টায় গার্মেন্ট বন্ধ থাকলে এলাকায় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায়। এ বিষয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে। তিন দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে আরো বৃহত্তর আন্দোলন করা হবে। ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানান, এলাকাবাসী গ্যাসের দাবিতে রাস্তায় বিক্ষোভ করে। পরে তাদের গ্যাস সমস্যা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিলে পরিস্থিত শান্ত হয়। 

Comments

comments