ব্রেকিং নিউজ

রাজনীতির দুষ্টচক্রের স্বীকার আমরা ব্যাবসায়ীরা

বাবরচলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসার ওপরও পড়েছে। গাড়ির বিক্রি যেমন কমে গেছে, তেমনি সমুদ্রবন্দরে আটকে আছে কয়েক হাজার আমদানি করা গাড়ি। এসব বিষয় ‘দ্য বিডি এক্সপ্রেস’ সঙ্গে আলাপ করেছেন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যাল ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের অন্যতম পরিচালক মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর।
 দ্য বিডি এক্সপ্রেসঃ চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসার অবস্থা কী?
মাহবুবুল হক চৌধুরী: কয়েক দিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে আমরা বলেছিলাম, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হরতাল-অবরোধে আমাদের সাত হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জাপান থেকে আমরা পাঁচ বছরের পুরোনো গাড়ি আমদানি করি। আমদানি করা ৫ হাজার ৬৫৫টি গাড়ি শোরুমে অবিক্রীত পড়ে আছে। এই তিন মাসে গাড়ির ব্যবসা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮০ শতাংশ কম হয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত কিছু গাড়ি বিক্রি হয়েছে, কিন্তু সেটা খুবই নগণ্য। ঢাকায় রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ১০৯টি শোরুম আছে। প্রতিটি শোরুমে ২০-২৫টি গাড়ি মজুত থাকে। ক্রেতারা শোরুম ঘুরে গাড়ি কেনেন। কিন্তু আমরা তো শোরুমই খোলা রাখতে পারিনি। বিক্রি হবে কীভাবে? আবার সময়মতো সরবরাহ না করতে পারায় আমাদের প্রায় এক হাজার গাড়ির অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে।
দ্য বিডি এক্সপ্রেসঃ  এই তিন মাসে কী কী সমস্যা মোকাবিলা করেছেন?
মাহবুবুল হক চৌধুরী: বড় সমস্যা হলো, সহিংসতার কারণে আমদানি করা গাড়ি ঝুঁকি নিয়ে আমরা চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে খালাস করতে পারিনি। ৩ জানুয়ারি থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত দুই বন্দরে গাড়ি পড়ে আছে ৭ হাজার ৮২৮টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ হাজার ৩১টি এবং মংলা বন্দরে ৪ হাজার ৭৯৭টি গাড়ি পড়ে আছে। গাড়ি আটকে থাকায় এ পর্যন্ত ডেমারেজ চার্জ গুনতে হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। তিন সপ্তাহ পড়ে থাকলেই প্রতিটি গাড়ির জন্য প্রতিদিন ৪৫২ টাকা ডেমারেজ চার্জ দিতে হয়। আমি তো ডেমারেজ চার্জ দেওয়ার জন্য গাড়ি আমদানি করিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই চার্জটা আমাদের বাড়তি দিতে হচ্ছে। আবার স্বাভাবিক সময়ে দুই বন্দর থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০টি গাড়ি খালাস হয়। গত তিন মাসে বের হয়েছে গড়ে ১০টি। আমাদের গাড়িগুলো বন্দর থেকে চালক দিয়ে চালিয়ে আনতে হয়। কিন্তু যেভাবে গাড়ি পোড়ানো হয়েছে, তাতে আমরা ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি বের করিনি। চালকেরাও ঝুঁকি নিতে রাজি হননি। আমরা যে অল্প কিছু গাড়ি খালাস করেছি, তার সবগুলোই শুক্র ও শনিবার।
দ্য বিডি এক্সপ্রেসঃ  সেদিন সংবাদ সম্মেলনে তো বলেছিলেন, এবার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের অনুকূলে ছিল।
মাহবুবুল হক চৌধুরী: এখনো তা-ই বলছি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায় বিপণন সহায়ক পরিবেশ বিরাজ করে। কারণ, ডিসেম্বরের পর ব্যাংকগুলো বেশি করে গাড়ির ঋণ ছাড় করে। ক্রেতারা এ সময়ের জন্য অপেক্ষা করেন। ব্যবসায়ীরাও অক্টোবর থেকে গাড়ি আমদানি বাড়িয়ে দেন। এবার জাপানের মুদ্রা ইয়েনের মূল্য এবং দেশে ডলারের দাম নিম্নমুখী হওয়ায় জাপানি গাড়ির দাম ও শুল্কের পরিমাণ কমে যায়। ফলে এবার পরিস্থিতি ক্রেতাদের অনুকূলে ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবকিছু ভেস্তে যায়। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ক্রেতাই গাড়ি কেনেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। ব্যাংক দেখে, গাড়িটি পাঁচ বছরের কম পুরোনো কি না। এখন আমাদের শোরুমগুলোতে যেসব গাড়ি পড়ে আছে, তার মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ গাড়ি ২০০৯ মডেলের (অর্থাৎ পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো)। এগুলো আমরা গত বছর কিনেছিলাম। তখন তা পাঁচ বছরের কম পুরোনো ছিল। এসব গাড়ি নিয়ে আমরা ঝুঁকিতে আছি। কারণ, ব্যাংক এই গাড়ি কেনার জন্য ঋণ দেবে না। ক্রেতারা যদি এখন গাড়ি কেনেন, তাহলে তারাও ২০১০ মডেলের গাড়িটাই চাইবেন। তাহলে ২০০৯ মডেলের গাড়িগুলোর কী হবে? আমরা তো আমদানি নীতি মেনেই গত বছর এসব গাড়ি আমদানি করেছিলাম। এ অবস্থায় ২০০৯ মডেলের গাড়ি কেনায় ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা না হয়, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
দ্য বিডি এক্সপ্রেস: বন্দরে পড়ে থাকা গাড়ির তো নিলাম-প্রক্রিয়া শুরু করেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ।
মাহবুবুল হক চৌধুরী: শুল্ক আইনের ৮২ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো আমদানি পণ্যই বন্দরে পৌঁছানোর ৩০ দিনের মধ্যে খালাস করতে হয়। তা না হলে কর্তৃপক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে তা খালাস করতে আমদানিকারককে নোটিশ দেয়। তাও না করলে কর্তৃপক্ষ ওই পণ্য নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত করে। আমাদের ৬০ শতাংশ গাড়ি ইতিমধ্যেই নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতিতে আমরা এসব গাড়ি খালাস করতে পারিনি, তা কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে না। আবার চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের স্থায়ী আদেশ অনুযায়ী, নিলামের জন্য তালিকাভুক্ত হলে ওই গাড়ির জন্য ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মংলা বন্দরে এই জরিমানা নেই। এই জরিমানা খুবই অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক। আমরা এটি নিয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বাতিল চাই।
দ্য বিডি এক্সপ্রেসঃ  তাহলে আপনাদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ কী?
মাহবুবুল হক চৌধুরী: ধরুন, আগামীকালই যদি দেশে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলেও আমাদের সমস্যা কাটবে না। কারণ, আমাদের কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, যে পরিমাণ গাড়ি শোরুমে অবিক্রীত পড়ে আছে, সমঝোতা হয়ে গেলে সেগুলো তো রাতারাতি বিক্রি করতে পারব না। বন্দরে পড়ে থাকা গাড়িগুলোও এক সঙ্গে বের করে ফেলতে পারব না। এত গাড়ি শোরুমে নিয়ে গিয়ে তখন কী করব? এত গাড়ি এখন বিক্রি করাও কঠিন। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রতিবছরই বাজেটের আগে-পরে বিশেষ করে মে মাস থেকে গাড়ির বিক্রি কমে যায়। বাজেটে শুল্ক বাড়বে, না কমবে—এই দোটানায় ক্রেতারা গাড়ি কেনেন না। দ্বিতীয়ত, এই খাতে ব্যাংকের অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা অর্থ লগ্নি রয়েছে। এই ঋণ তিন মাসমেয়াদি। গাড়ি বন্দরে আটকে থাকায় এবং বিক্রি না হওয়ায় আমরা সুদের চক্রে পড়ে গেছি। অন্যদিকে তিন মাসের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ব্যাংক আমাদের ঋণখেলাপির তালিকায় ফেলে দেবে। সর্বনাশা রাজনীতির চক্রে পড়ে গেছি আমরা। আমরা জানি না সরকারি কোনো প্রণোদনা ছাড়া এ অবস্থা থেকে বের হব কীভাবে?
দ্য বিডি এক্সপ্রেসঃ  ২০২১ সালকে ঘিরে আপনাদের যে ভিশন, সেটা বাস্তবায়ন কি আদৌ সম্ভব?
মাহবুবুল হক চৌধুরী: আমাদের ভিশনটি হলো, ২০২১ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সবচেয়ে কম পরিবেশ দূষণকারী ব্যক্তিগত মোটরগাড়ির দেশ। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে পেছনে ফেলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি-সাশ্রয়ী মোটরযান ব্যবহারকারীর শীর্ষে থাকবে বাংলাদেশ। জাপান এখন হাইব্রিড ইঞ্জিনযুক্ত গাড়ি, এমনকি বাস-ট্রাকও তৈরি করছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাপানের ব্যক্তিগত গাড়ির মোট উৎপাদনের ৩৭ শতাংশই হাইব্রিড গাড়ি। এসব গাড়ি জ্বালানি-সাশ্রয়ী। এখন সরকারকে যত জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, তা ৮০ শতাংশ কমে যাবে যদি রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি আমদানি করতে দেওয়া হয়। কিন্তু এনবিআর হাইব্রিড গাড়ির জন্য আলাদা একটি এইচএস কোড করেছে। সেটা মূলত নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিকে উৎসাহিত করার জন্য। কিন্তু নতুন হাইব্রিড গাড়ির দাম ৭৫ লাখ টাকা। এই টাকায় কে গাড়ি কিনবে? আমাদের দাবি, বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় যেন আমরা রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি আমদানি করতে পারি।

Comments

comments