ব্রেকিং নিউজ

ইতিহাসের স্বাক্ষী ঐতিহাসিক জিনজিরা প্রাসাদ ধ্বংসের পথে

জিনজিরা প্রাসাদদ্য বিডি এক্সপ্রেসঃ বাংলার সুবাহদার ও স্বাধীন বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খানের বাসভবন এই জিনজিরা প্রাসাদ। ঢাকার নায়েব নাযিম নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানের প্রতিনিধি হোসেন কুলি খানসহ বেশ কয়েকজন প্রশাসক। শায়েস্তা খান পরবর্তী বাংলা থেকে ব্রিটিশ বাংলার অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এ প্রাসাদ। ইতিহাসের বেদনাবিধূর ঘটনারও সাক্ষী এটি। নবাব সরফরাজ খান, হোসেন কুলি খানের পরিবারের সদস্যদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল এখানে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী-কন্যা, আলীবর্দী খানের স্ত্রী শরীফুন্নেসা এবং সিরাজের পতন-ষড়যন্ত্রে জড়িত ঘসেটি বেগমকেও এ প্রাসাদে বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছিল। মোগল ও ব্রিটিশ বাংলার ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি ইতিহাসে জিনজিরা প্রাসাদ নামে পরিচিত। ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরায় অবস্থিত প্রাসাদটির আদি নাম ‘কস সাদের দুইটি ভগ্ন অংশ  কোনরকমে জীর্ণ অবস্থায় টিকে রয়েছে। যত্ন ও সংরক্ষণের অভাবে এবং বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাসাদের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও। 

বাংলার মোগল সুবাহদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম খান (১৬৮৯-১৬৯৭) ১৭ শতকের শেষার্ধ্বে জিনজিরা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। এর চারপাশে পরিখা খনন করা হয়েছিল। ফলে এটি প্রাসাদোপম দুর্গের মর্যাদা পায়। পুরান ঢাকার বড় কাটরা প্রাসাদ-দুর্গের প্রায় দক্ষিণ বরাবর বুড়িগঙ্গার ওপারে বড় কাটরার ক্ষুদ্র আদলে নির্মিত হয় এই প্রাসাদ। তখন বুড়িগঙ্গা নদী বর্তমানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি প্রশস্ত ছিল। নদীর তীর ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছিল প্রাসাদটি। নদীর ওপর একটি কাঠের সেতু নির্মাণ করে কাটরার কাছেই ঢাকা শহরের সাথে এর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছিল। প্রাসাদস্থলটি তখন চারপাশে নদী দিয়ে বেষ্টিত ছিল। এ কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছিল দ্বীপের প্রাসাদ।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, আদিতে জিনজিরা প্রাসাদে ছিল মূল প্রাসাদ ভবন, আয়তাকার সুবিস্তৃত দ্বিতল হাম্মাম (গোসলঘর), দক্ষিণের সদরে প্রহরী-কক্ষসহ দ্বিতল প্রবেশ ফটক এবং অষ্টকোণী পার্শ্ববুরুজ। পলেস্তরাবিশিষ্ট দেয়ালঘেরা কক্ষগুলো ছিল আয়তাকার এবং ওপরে কুঁড়েঘর আকৃতির চৌচালা খিলানাকার ছাদ। প্রাসাদের পূর্বাংশে ছাদ থেকে একটি সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে। প্রাসাদের বহির্দেয়াল ছিল সুপ্রশস্ত ও ভিত্তিমূল ছিল গভীর। সবমিলিয়ে প্রাসাদটির নির্মাণশৈলী বড়কাটরার আদলে হলেও এর মোট আয়তন ও কক্ষের আয়তন ছিল কাটরার চেয়ে অনেক কম। চারদিকে পানির মধ্যে কয়েক একর জমির ওপর নির্মিত  প্রাসাদটি দেখতে অনেকটা দ্বীপের মতই ছিল। ইতিহাসবিদদের ধারণা, অবকাশ যাপনকেন্দ্র বা প্রমোদ কেন্দ্র ‘কস -ই-জাজিরা’র নামের অপভ্রংশ থেকেই আজকের জিনজিরার নামকরণ হয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ইতিহাস বিখ্যাত জিনজিরা প্রাসাদ বর্তমানে নিশ্চিহ্নপ্রায়। এর আদিরূপ ধ্বংস হয়েছ। বর্তমানে প্রাসাদটির দুইটি অংশ পৃথকভাবে টিকে রয়েছে। এর একটি পূর্বাংশের তিনতলা সমান একটি স্থাপনা। এটি অনেকটা ফাঁসির মঞ্চ বা সিঁড়িঘর বলে মনে হয়। প্রাসাদের মূল তোরণটির ভগ্নাংশ এ অংশের সাথে সংযুক্ত রয়েছে। ভগ্ন কয়েকটি কক্ষবিশিষ্ট অপর অংশটিও জীর্ণ অবস্থায় টিকে রয়েছে। টিকে থাকা স্থাপনাটুকুও ভেতরে-বাইরে অবর্জনায় পূর্ণ। দীর্ঘদিনের অব্যবহার ও অযত্নের ফলে গাছের শিকড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছে ভঙ্গুর দেয়ালগুলো। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে জন্মেছে পরগাছা। ছাদ থেকে ভিত্তি পর্যন্ত ছোট-বড় ফাটল ও গর্তে পূর্ণ। প্রাসাদ এলাকাসহ সন্নিহিত এলাকায় বাড়ি-ঘর ও দোকানপাট গড়ে উঠেছে। ফলে একেবারে নিশ্চিহ্নপ্রায় প্রাসাদটির কাছে না গেলে দূর থেকে এর অস্তিত্ব বোঝা যায় না।
২০০৩ সালে প্রকাশিত বাংলাপিডিয়ায় প্রাসাদটির ধ্বংসাবশেষের চিত্র তুলে ধরে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল প্রাসাদের সাতটি কক্ষ এখনও ভগ্নপ্রায় অবস্থায় টিকে আছে। অপরাপর টিকে থাকা স্থাপনার মধ্যে রয়েছে দুটি অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ববুরুজ, দক্ষিণ দিকের ভগ্নপ্রায় ফটক, প্রাসাদের সুপ্রশস্ত ভিত এবং পরিখা। কিন্তু গত বুধবার সরেজমিন ঘুরে বাংলাপিডিয়ায় বর্ণিত ওই ধ্বংসাবশেষও দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রাসাদের জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। ১০-১২ বছর আগেও তিনটি পৃথক অংশে বিভক্ত হয়ে প্রাসাদটির বেশ কিছু অংশ টিকে ছিল। কিন্তু দক্ষিণাংশটি ভেঙে সেখানে নতুন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। তবে প্রাসাদটির ধ্বংসের শুরু আরো আগে থেকে। পাকিস্তান আমলেই প্রাসাদটি প্রায় অব্যবহূত ছিল। অব্যবহার ও অবহেলায় এটি জীর্ণ হতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর এ এলাকায় মানুষের বসতি বিস্তৃত হতে শুরু করে। একপর্যায়ে এর বহির্দেয়াল এবং পরে মূল প্রাসাদের দেয়াল ভেঙে স্থানীয়রা বাড়ি-ঘর ও দোকানপাট নির্মাণ করেছেন।
জানা যায়, ব্রিটিশ আমলেই মালিকি ও তত্ত্বাবধায়ক সূত্রে প্রাসাদ ও সন্নিহিত এলাকার ১৪ শতক জমি সাফ কবলা মূলে কিনেছিলেন স্থানীয় হাজী অজিউল্যাহ। ওয়ারিশ সূত্রে বর্তমানে এর মালিক জাহানারা বেগম ও তার ছয় সন্তান। এ ছয় সন্তানের একজন গোলাম আজম বলেন, ওয়ারিশ সূত্রে প্রাসাদ এলাকায় তারা বাস করছেন। প্রাসাদটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। এটি এখন আর সংস্কার করা সম্ভব নয়।
স্মৃতিঘেরা জিনজিরা প্রাসাদ: জেমস টেইলরের ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ বইয়েও জিনজিরা প্রাসাদের নির্মাতা হিসেবে ইব্রাহিম খানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলার দিওয়ানি লাভের পর মুর্শিদকুলী খান এ প্রাসাদে বসবাস করতেন। ১৭০৩ সালে তার রাজস্ব প্রশাসন দপ্তর মকসুদাবাদে স্থানান্তরের (১৭০৩) পূর্ব পর্যন্ত প্রাসাদটি তার আবাসস্থল ছিল। এরপর বিভিন্ন সময় ঢাকা সফরকালে তিনি এ প্রাসাদেই অবস্থান করতেন। নবাব আলীবর্দী খানের অধীনে ঢাকার নায়েব নাযিম নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানের প্রতিনিধি হোসেন কুলি খানের পারিবারিক আবাসস্থল ছিল এ প্রাসাদ। বাংলার ইতিহাসের অনেক বিয়োগান্তক ও বেদনাবিধুর ঘটনারও সাক্ষী এই প্রাসাদ। নবাব সরফরাজ খানের (১৭৩৯-১৭৪০) পতনের পর তার মা, স্ত্রী, বোন, পুত্রকন্যা এবং তার হারেমের কয়েকজন নারীকে এ প্রাসাদে অন্তরীণ রাখা হয়। ১৭৫৪ সালে হোসেন কুলি খানের হত্যাকাণ্ডের পর এ প্রাসাদে বসবাসরত তার পরিবার পরিজনকেও বন্দীজীবন যাপন করতে হয়। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর আলীবর্দী খানের স্ত্রী শরীফুন্নেসা, সিরাজের মা আমেনা বেগম, সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুত্ফুন্নেসা বেগম, তার মেয়ে কুদসিয়া বেগম ওরফে উম্মে জোহরাকে জিনজিরা প্রাসাদে অন্তরীণ রাখা হয়। তাদের সাথে অন্তরীণ করা হয় পলাশী যুদ্ধের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ঘসেটি বেগমকেও। ১৭৬০ সালে এ প্রাসাদ থেকে নিয়ে গিয়ে আমেনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে ধলেশ্বরী নদীতে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে লর্ড ক্লাইভের হস্তক্ষেপে শরীফুন্নেসা, লুত্ফুন্নেসা বেগম ও উম্মে জোহরাকে মুর্শিদাবাদে পাঠানো হয়।
ইতিহাস জানেন না স্থানীয়রা: স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকাংশই জিনজিরা প্রাসাদটিকে ‘হাওলি নগেরা’ বা ‘হাওলি নওগরা’ বলে ডাকেন। হাওলি শব্দটি ইংরেজি হাভেলি শব্দের অপভ্রংশ। বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরা প্রাসাদটিতে ঘসেটি বেগমকে বন্দী করা হয় বলে জানলেও বিস্তারিত ইতিহাস জানেন না। তরুণ প্রজন্ম প্রাসাদটিকে একটি জায়গা হিসেবেই জানেন। এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না। জিনজিরা প্রাসাদ এলাকায় স্থাপনাটি সম্পর্কে কোনো বর্ণনা বা পরিচিতি প্রকাশ করা হয়নি। এর ওপর স্থাপনাটির চারদিকেই গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। তাই যেমনভাবে প্রায়নিশ্চিহ্ন হয়েছে প্রাসাদভবনটি, তেমনিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এর গৌরবগাথাও।
এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হলো বিদ্যমান প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিচিহ্নগুলো। জিনজিরা প্রাসাদ ইতিহাস রচনারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারত। কিন্তু অবহেলা ও অযত্নে সেই সুযোগ অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অতীত গৌরবের এই প্রাসাদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা  করতে হবে।সুত্রঃ ইত্তেফাক

Comments

comments