ব্রেকিং নিউজ

অগণতান্ত্রিক চর্চার ফলেই অস্থিতিশীলতা’

রেহমানপ্রতিবেদক : রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক চর্চার ফলেই দেশে ঘন ঘন অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান।

রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক সেমিনারে শনিবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশন সেমিনাটির আয়োজন করে।

সিপিডির চেয়ারম্যান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা না করার ফলে দেশে ঘন ঘন অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সেনাবাহিনীর প্রশ্নটি বার বার উঠে আসছে। অর্থাৎ তাদের অগণতান্ত্রিক চর্চার ফলেই সেনাবাহিনীর ভূমিকার বিষয়টি উঠে আসছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর ভূমিকা আমরা দেখেছি। তারা সঙ্কটের মুহূর্তে যে ভূমিকা পালন করেছে সেটা দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনেনি।

সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনীর দায়িত্ব পালন করার কথা নয় উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো কেন সুষ্ঠু রাজনীতির চর্চা না করে বার বার সেনাবাহিনীকে মাঝখানে টেনে আনছে, সেটা বোধগম্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘৭০ সালের নির্বাচনের সময় ইয়াহিয়া খানকে তৎকালীন গেয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য দিয়েছিল যে, নির্বাচন হলে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিজয়ী হবে না। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ইয়াহিয়া খান নির্বাচন দিয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পাস করল, তখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে গণহত্যার পথ বেছে নিলেন। এই ঘটনা শেখ হাসিনাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি হয়ত উৎসাহিত করেছিল যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। আর হলেও ক্ষমতা হস্তান্তর করতে ক্ষমতাসীন দল গড়িমসি করবে। তাই তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।’

রেহমান সোবহান বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে আমি একটা ভূমিকা রেখেছিলাম। এখন অনেকেই আমাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে। আমি তাদের বলেছি, আমাদের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তখনকার পরিস্থিতি অনেক জটিল ছিল। তবুও আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে পেরেছিলাম। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, যারা এই সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন করেছিল, আজ তারাই সংবিধানের দোহাই দিয়ে সবচেয়ে বেশী এর বিরোধিতা করছে।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘গত ২৫ বছরে কোনো রাজনৈতিক দল প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা করেছে কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে চলতে থাকা রাজনৈতিক চর্চা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করছে। এর নেতিবাচক প্রভাব যখন প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে, তখন আমূল পরিবর্তনের কথা উঠে আসছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন কীভাবে হবে, কোন পদ্ধতিতে হবে, সেটা সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানেন।’

তিনি বলেন, ‘একদিক থেকে এমপিরা পূর্ণ জনসম্পৃক্ত কিনা, সে বিষয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে।’

বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় এমপিদের স্থানীয় সুবেদার কিংবা স্থানীয় বাদশাহর সঙ্গে তুলনা করা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা তাদের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। ফলে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন না হলে জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে না। ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় না থাকলে গণতান্ত্রিক চর্চা বজায় রাখা সম্ভব হবে না। গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হলে প্রকৃত জনসমর্থনে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত করা যাবে না। সেটা সম্ভব না হলে জনগণেরও কোনো উপকার হবে না।’

সিপিডির চেয়ারম্যান বলেন, ‘একদিকে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে না। অন্যদিকে একের পর এক হরতাল ডাকা হচ্ছে।’

মহাত্মা গান্ধী প্রথম হরতাল ডেকেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিনি (মহাত্মা গান্ধী) বলেছিলেন, এই হরতালে সরকারের কোনোপ্রকার কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না থাকতে। অর্থাৎ সরকারের সকল কাজে অসহযোগিতা করা। সে সময় দেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনকার হরতালে জনগণের কোনোপ্রকার সম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে হরতাল ডাকা হলেই সহিংস ঘটনা ঘটছে।’

হরতালের নামে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলসমূহ তাদের আন্দোলনের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে এই আন্দোলনের কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং দেশের ক্ষতি হচ্ছে।’

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসের দিকে তাকালে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আমরা দেখেছি। ফলে বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল অন্তত এই বিষয়টিতে হয়তো মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে একমত হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থায় আর ফিরে যাওয়া যাবে না। বিএনপি সরকারের আমলে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতায়ন চেয়েছিলেন বলে তাকে অপসারিত হতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ের সকল রাষ্ট্রপতিকে অনেকটা সরকারের অনুগতই বলা চলে।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল্লুর রহমান খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এনাম আহমেদ চৌধুরী, ড. রওনক জাহান, সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন প্রমুখ।

Comments

comments