ব্রেকিং নিউজ

স্নায়ু যুদ্ধের দ্বার প্রান্তে বিশ্ব

আনিস আলমগীর॥

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে এবার ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে anis alamgirপ্রধান অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। বারাক ওবামা শুধু কুচকাওয়াজ, সালাম নিতে আসেননি; ভারতকে ‍নিয়ে আমেরিকার দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্খা পূরণেরও চেষ্টা করেছেন। শতাংশে সফল না হলেও বহুলাংশে ওবামার ভারত সফর সফল হয়েছে। সেই সঙ্গে তার এই সফর এই অঞ্চলে সৃষ্টি করেছে নতুন কিছু উদ্বেগের।

শীর্ষ স্থানীয় ভারতীয় একজন কূটনীতিক এবং লেখক সরদার কে এম পানিক্কর তাই ‘এশিয়া এ্যান্ড ওয়েস্টার্ন ডমিনান্স’ বইতে (১৯৫৩ সালে প্রকাশিত) লিখেছেন, ‘আমেরিকা ভারতকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে দেশটিকে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটা শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিল কিন্তু নেহরুর অসম্মতির কারণে তা হয়ে উঠেনি।’ সেটি অনেক আগের কথা। স্নায়ু যুদ্ধের অবসানের পর পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে গত ২০ বছর ধীরে ধীরে আমেরিকার সঙ্গে একটা অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলার পর্যায়ে যাচ্ছিল ভারত। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর ভারসাম্যটা রক্ষা না করে খুবই দ্রুতগতিতে আমেরিকার সঙ্গে সামরিক, বাণিজ্যিক বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন করে মার্কিন বলয়ে ঝুকে গেলেন। ওবামা ৩০ জন বড় উদ্যোক্তা সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। তারাও ভারতীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ব্যাপক কথাবার্তা বলে গেছেন। ভারতের মানুষ এতেই উৎফুল্ল। ভারতের জনগণ চায় চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভারতও চীনের মতো এগিয়ে যাক। বিগত কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চীনের সঙ্গে এ প্রতিযোগিতা আরম্ভ করতে পেরেছিলেন বলে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারতকে শুধু অনেক কিছু যে দিয়ে গেলেন তা নয়, গঠনমূলক সৎ উপদেশও দিয়ে গেছেন। তিনি তার ভাষণে বলেছেন, “ ভারত ততক্ষণ সফল যতক্ষণ ধর্মের ভিত্তিতে নিজেকে ভাগ না করবে।”

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারতকে শুধু অনেক কিছু যে দিয়ে গেলেন তা নয়, গঠনমূলক সৎ উপদেশও দিয়ে গেছেন। তিনি তার ভাষণে বলেছেন, “ ভারত ততক্ষণ সফল যতক্ষণ ধর্মের ভিত্তিতে নিজেকে ভাগ না করবে।” দুই দেশেই নানা জাতের, নানা ধর্মের লোক বাস করে। এই বৈচিত্রের মাঝে ঐক্যই বড় শক্তি। ওবামা স্মরণ করিয়ে দেন, “আমরা এমন দেশের বাসিন্দা হতে পেরে গর্বিত যেখানে রাঁধুনীর নাতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন, দলিতের ছেলে হন ভারতের সংবিধানের রচয়িতা আর চা ফেরিওয়ালা হন প্রধানমন্ত্রী।” বক্তৃবাজিতে ওবামার জুড়ি নেই বিশ্বে। নায়ক শাহরুখের সিনেমার ডায়লগ বক্তৃতায় জুড়ে দিয়েও মিডিয়ার দৃষ্টি কেড়েছেন ওবামা। বিজেপির সংঘ পরিবার যেখানে ‘ভারত হিন্দুদের’ দাবি করে আসছে সেখানে তার এই বক্তৃতা ছিল তাদের জন্য মোক্ষম দাওয়াই।

প্রশ্ন হচ্ছে ওবামা এতো কিছু উজাড় করে দিলেন কেন? তার বিশ্লেষণ করেছেন অনেকে। সবচেয়ে সুন্দর কথা বলেছে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা। ‘আলিঙ্গনের পরে’ শিরোনামে তারা বলেছে “নরেন্দ্র মোদীর স্বহস্তে প্রস্তুত চা পান করিবার জন্য বারো হাজার কিলোমিটার উড়িয়া আসেন নাই। দিল্লির রাজপথে সামরিক কুচকাওয়াজ এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী দেখিবার জন্যও নহে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক সফরের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের এক ও অদ্বিতীয় কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ। স্বার্থ বহুমাত্রিক। প্রথম ও প্রধান মাত্রাটির নাম- চীন। তাহার প্রমাণ রহিয়াছে এই সফর উপলক্ষে প্রকাশিত ভারত-মার্কিন যৌথ বিবৃতিতে। পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র পথে এবং আকাশ যাত্রায় নিরাপত্তা রক্ষায় দুই দেশেরে অঙ্গীকারেই বিবৃতি থামে নাই, সরাসরি বিশেষত সাউথ চায়না সি অঞ্চলে সহযোগিতায় জোর দিয়েছে। সাউথ চায়না সিতে গত কয়েক বছর চীনের আগ্রাসী নীতির প্রেক্ষিতে এই বিবৃতির তাৎপর্য অতি স্পষ্ট। চীন সেই তাৎপর্য বুঝিতে কিছু মাত্র ভুল করে নাই। বেইজিং সচরাচর কোন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাইতে অন্তত আঠারো মাস সময় লইয়া থাকে অথচ ওবামা-মোদীর কূটনৈতিক অভিযানকে ‘অগভীর’ বলিয়া বাতিল করিতে চব্বিশ ঘণ্টাও লাগে নাই।”

নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করেছে, “দুই নেতার বিবৃতি চীনকে চঞ্চল করে তুলেছে।” সম্ভবত চীন বুঝতে পেরেছে যে আমেরিকা, জাপান আর ভারতের মাঝে একটা যৌথ শক্তি গড়ে উঠার সম্ভাবনা সামনে রেখে তিন দেশ অগ্রসর হচ্ছে। তারা দক্ষিণ এশিয়ায় চীনকে রুখে দাঁড়াতে সচেষ্ট হবে। ওবামার সঙ্গে বৈঠকে মোদী নাকি ৪৫ মিনিট চীনের উত্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দেশটির কৌশলগত অবস্থানের প্রভাব সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। মোদির এ বয়ানে নাকি ওবামা ও তার সফরসঙ্গীরা মুগ্ধ ও অবিভূত হয়েছেন। মোদী নিজেই যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ঐক্যের প্রস্তাব দিয়েছেন। সম্ভবত চীনের উত্থানে ভারত কিছুটা সংকিত হয়েছে। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল। চীন আসামের ডীব্রুগড়ে এসে উপস্থিত হয়েছিল। অবশ্য পরে নিজেরাই দখলকৃত জায়গা ছেড়ে চলে যায়। চীন দাবী করে অরুণাচল তার জায়গা, কাশ্মীরের লাদাকও চীনের অঞ্চল। কখনও ম্যাকমোহন লাইনকে চীন সীমান্ত রেখা হিসেবে মেনে নেয়নি। অথচ বার্মার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে চীন ম্যাকমোহন লাইনকে সীমান্ত রেখা হিসেবে মেনে নিয়েছিল। নেপালের সঙ্গেও চীনের সীমানা চুক্তি হয়েছিল। যদিও চীন মাউন্ট এভারেস্টকে তার জায়গা বলে সরকারি ম্যাপে দেখিয়েছে চুক্তিতে কিন্তু পর্বত শৃঙ্খটিকে দুই দেশের সীমান্ত রেখা হিসেবে মেনে নিয়েছে। তবে ভারতের সঙ্গে চীন কোনও সীমান্ত চুক্তি করতে পারেনি। ভারতের দাবী মধ্য সীমান্তে চীন ভারতের ৫ শ’ বর্গ মাইল ভারতীয় এলাকা আর উত্তর সীমান্তে প্রায় সাত শ’ বর্গ মাইল ভারতীয় এলাকা দখল করে আছে। চীনের সিং কিয়াং প্রদেশের ইয়ে চেং থেকে যে রাস্তাটি তিব্বতের গার-টক পর্যন্ত গেছে- সে রাস্তাটি সম্পূর্ণ ভারতের জায়গার উপর নির্মাণ করা হয়েছে। সিং কিয়াং প্রদেশে প্রবেশের জন্য সে রাস্তাটি ছাড়া অন্য কোনও রাস্তা নেই।

আমেরিকা আটলান্টিক থেকে তার নৌশক্তি এবং বিনিয়োগ প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর এলাকায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তারা তাদের নৌশক্তি আরও বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের আর্থিক দুর্দিনেও তারা সেই পরিকল্পনার দশ বছরের খরচের টাকা পেন্টাগনের হাতে দিয়ে দিয়েছে। ২০৫০ সালের মাঝে নাকি তারা তাদের নৌশক্তি বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করবে। বর্তমানে আমেরিকার নৌবহরে আছে ২৮০টি যুদ্ধ জাহাজ। ২০৫০ সালে নাকি যুদ্ধ জাহাজের সংখ্যা হবে ৩০০ টি। দুনিয়ার বৃহত্তম নৌবহর। তারা চীনকে সান্তনা দিয়ে বলেছে আমেরিকার এ প্রস্তুতি চীনকে লক্ষ্য করে না কিন্তু চীন এই সান্তনা বাক্যে সন্তুষ্ট হয়নি। তারাও তাদের নৌশক্তি বৃদ্ধি ও পূণঃবিন্যাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিমান বাহিনীর শক্তিও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছে। ১৯৫০ সালে কোরিয়ার যুদ্ধের সময় আমেরিকা চীন আক্রমণ করেছিল। জেনারেল ম্যাক ‍আর্থার ছিল যুদ্ধের দায়িত্বে। সে বছর ৩০ অক্টোবর চীনা গণফৌজের মুখোমুখি হয় আমেরিকান বাহিনী। তিন লক্ষ গণফৌজের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে আমেরিকান বাহিনী। পিছু হটতে হটতে ম্যাক আর্থারের বাহিনী সাগরে গিয়ে পড়ার দশা হয়। সেটাই ছিল কোনও আমেরিকান বাহিনীর দীর্ঘতম রিট্রিট। দীর্ঘতম পিছুহটা। শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয় বরণ করে। তখন চীন ছিল দরিদ্র আর এখন বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রের মধ্যে তার অবস্থান শীর্ষে।

ওবামার সঙ্গে মোদী যখন বৈঠক করেছিলেন তখন বেইজিং-এ পাকিস্তানের সেনা প্রধান রাহিল শরীফকে সংবর্ধনা দিচ্ছিলো চীন। চীন বলেছে, পাকিস্তান তার অকৃত্রিম বন্ধু। শুধু তাই নয়, মার্চে পাকিস্তান ডে পালন উপলক্ষে পাকিস্তান মিলিটারি সাত বছর বিরতির পর পূর্ণ মাত্রায় মিলিটারি প্যারেডে তাদের জৌলুস প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চীন আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের ৭০তম বার্ষিকীতে বেইজিং-এ এক সামরিক কুচকাওয়াজ হবে। তাতে প্রধান অতিথি হবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুটিন। অভিজ্ঞ জনেরা এটাকে মেরুকরণ হিসেবে ধরে নিবেন কিনা কি জানি!

ভারতে ১২০ কোটি লোকের বসবাস। মনমোহন সিং এর সরকার দাবী করেছিলেন ভারতে দারিদ্র সীমার নীচে ২২ শতাংশ লোক রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাপের প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানে না। ২০১৩ সালে McKinsey Global Institute সার্ভে করে দেখিয়েছে ভারতের ৫৬ শতাংশ জনসংখ্যা (৬৮ কোটি লোক) দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। জীবনের জরুরী প্রয়োজনীয় খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা থেকে তারা বঞ্চিত। নরেদ্র মোদী এদের ভাগ্য উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন। মোদীর পক্ষে গতানুগতিক পথে হেটে এদের ভাগ্য উন্নয়ন হয়তো সম্ভব নয়। তাই তিনি জাপান, আমেরিকায় ছুটাছুটি করছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে সন্মান দিয়ে রাষ্ট্রের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করে এনেছেন। ওবামার থেকে অনেক কিছু আদায় করেছেন নিজেও অনেক প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হয়েছেন।

প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হওয়ার সময় শ্রী মোদী মনে হয় চীনের বিষয়ে একটু অমনযোগী হয়েছেন। ১৯৬২ সালের পর এই দুটি রাষ্ট্রের জীবনীশক্তি ও বিস্তার প্রবণতা সত্ত্বেও তাদের মাঝে বড় রকমের কোনও বিরোধ ছিল না। মনমোহনের শাসনামলে সম্পর্কে কিছুটা সুবাতাসও বয়েছিল। মনে হয় মোদী ওবামার যৌথ বিবৃতি ভারত আর চীনের মাঝে একটা বিরোধের সূত্রপাত করে দিলো। চীনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করতেন রিজিওনাল পাওয়ার হিসেবে ভারত কোনও ব্লকের দিকে ঝুকে পড়বে না। আর এখন তারা বলছেন, টাকার লোভে ভারত আমেরিকার প্রেমে পড়েছে। আমেরিকা বিশ্ব ব্যবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানী, জাপান- বিশ্বের সর্বত্র আমেরিকাকে সহযোগিতা করছে। এবার তাদের সঙ্গে ভারতও কাতারবন্দী হলো। আর সেটি এই অঞ্চলকে কতটা অস্থির করে তুলে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Comments

comments