ব্রেকিং নিউজ

প্রশাসন কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি—সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

rizwana-front দেশে আবার পাহাড়-ধস। আবার মৃত্যুর মিছিল। কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্ত একান্ত নিজেদের স্বার্থে যা করছে তার ফলে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। পাহাড়-কাটার বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এরা পাহাড় কাটছে। তারপর সেখানে ঘর তুলে দরিদ্র-ভূমিহীনদের ভাড়া দিচ্ছে। পরিণতি বর্ষা এলে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়-ধসে ব্যাপক প্রাণহানি। একইভাবে চট্টগ্রামে জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিকরাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। সেখানেও আরেক শ্রেণীর পরিবেশ-দুর্বৃত্তের দাপট।

লক্ষ্য করে দেখুন, গোটা দেশটাই এমন কিছু গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি। এখন ঢাকা শহরে আবাসনের নামে কী হচ্ছে? জলাশয় ভরাট করেও আবাসন হচ্ছে। এখানে যে সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে তার বেনিফিসিয়ারি কারা? বেসরকারি বড়জোর তিন-চারটি আবাসন কোম্পানি। মূলত উচ্চবিত্ত, বড়জোর উচ্চ মধ্যবিত্তদের জন্য এ সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। আমি তো ঢাকা শহরে এমন কোনও উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তের কথা শুনিনি যার কোনও ফ্ল্যাট নেই বলে তিনি রাস্তায় থাকছেন। বরং দরিদ্ররা পথে পথে জীবন কাটাচ্ছেন। নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্তরা ঢাকায় থাকতে না পারলে পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাদের জন্য তো কোনও আবাসন ব্যবস্থা হচ্ছে না। তার মানে, এখানে সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। এটা পরিবেশ ন্যায়বিচারের একটা বড় দিক। এই ন্যায়বিচারের মূল বক্তব্য হল সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে এবং উন্নয়নটা টেকসই হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিলে কেন গণবিস্ফোরণ হলো? জনগণকে আস্থায় নিয়ে কাজটা করার চেষ্টা হয়নি বলে। এলাকার মানুষ চায় না এমন একটা উন্নয়নের মডেল তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। এতে তাদের জীবন এবং জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত। আবার যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তবে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির শিকার হতে থাকে সেখানেও কিন্তু মানুষ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হন। যেমন আদালতে মামলা করেন ইত্যাদি। তবে দেশে যদি সামগ্রিকভাবে পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করা যেত তবে এমনতরো ঘটনাগুলো ঘটত না।

বাস্তব সত্য হলো, আমরা কিন্তু এখন পরিবেশ-শাসনের দিক থেকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। আমাদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও যেন নেই। শিল্প এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা ব্যাপক দূষণের শিকার হচ্ছেন। হাজারিবাগ ট্যানারি কতজন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে? বিপরীতে ওখানকার বর্জ্য দিয়ে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী যে নদীর ওপর নির্ভরশীল পুরো ঢাকা শহরের দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, আহার এবং দৈনন্দিনের কর্মযজ্ঞ।

এখন ঢাকা শহরকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিততম নগরী বলা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের ভ্রান্ত উন্নয়ন কৌশল। আমরা উন্নয়নের জন্য যে মডেল বেছে নিয়েছি তা টেকসই নয়। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি মডেল যাতে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকেও উপকৃত করা যায়। আমাদের বেছে নেয়া মডেলটির ফলে আমাদের খেলার মাঠ চলে গেছে। পার্ক চলে গেছে। আমাদের রাস্তাঘাটে জ্যাম বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে। বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। শব্দদূষণ হচ্ছে ব্যাপক। অর্থাৎ আমাদের মডেলটি উন্নয়নের গতিকে আরও শ্লথ করে দিয়েছে। আমাদের কৈশোরে মনে আছে বনানী থেকে মগবাজারে আমাদের স্কুলে যেতাম দশ মিনিটে। এখন হরতালের দিন ছাড়া অন্য কোনও সময় এত দ্রুত বনানী থেকে মগবাজারে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে এই মডেলটা যে কাজ করেনি সেটাই এর প্রমাণ।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, কোনও কাজই কি হচ্ছে না? হ্যাঁ হচ্ছে। তবে প্রতিপত্তিশালী পরিবেশ-দুর্বৃত্তদের অন্যায়-কাজের তুলনায় তা কিছুই নয়। পরিবেশ বিভাগ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এখন কিছু কিছু পরিবেশ-অন্যায়কারীকে শাস্তি দিচ্ছে বটে কিন্তু এরা আবার আপিলে গিয়ে তা বাতিল করিয়ে নিয়ে আসছে। অনেক সময় দেখা যায় জরিমানা আদায়ের জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া দরকার তা খুব একটা কার্যকর হয় না।

ওদিকে সাধারণ মানুষ কিন্তু পরিবেশ আদালতে যায় না। কারণ পরিবেশ-অন্যায়কারীরা খুব শক্তিশালী। আর উচ্চতর আদালত থেকে আমরা পরিবেশ-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে যে সব মামলার রায় নিয়ে আসছি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই যেমন জাহাজ-ভাঙা শিল্পের কথাই বলছি। এ নিয়ে একটি নাটক চলছে প্রায় আড়াই বছর ধরে। আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সে শিল্পের জন্য সরকারকে একটি বিধিমালা তৈরির কথা বলেছিলেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে দুটো মন্ত্রণালয় থেকে দুটো আলাদা বিধিমালা পাঠানো হয়েছে। এতে আরও কনফিউশন তৈরির সুযোগ হলো। কারণ বিধিমালা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অনুমোদন দেওয়ার নীতি, আন্তর্জাতিক আইন- কোনও দিক থেকেই মিল নেই। তাই হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে বিধি দুটো পাঠানো হয়েছে কোনটি আদালতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা জানানোর জন্য। যতদিন এটা না হচ্ছে ততদিন কিন্তু জাহাজ-ভাঙা শিল্পে আগের মতোই কাজ চলছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছেন।

এই সব অনাচারের কারণে সারা দেশে নদীগুলো দূষিত হয়েই যাচ্ছে। বায়ুদূষণ হচ্ছে। শব্দদূষণ চলছে। সড়কগুলো নিরাপদ করা যায়নি। ঢাকায় যানজট ভয়াবহ। প্রতি বছর নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিক আর পাহাড়ের পাদদেশে থাকা মানুষগুলো মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছেন। আর প্রতিদিন, প্রতিদিনই ভূমিদস্যুরা নদী ও দরিদ্রদের জমি গ্রাস করছে।

তার মানে এ দেশের পরিবেশ-প্রশাসন এখন খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। সমস্যা হলো, পরিবেশ রক্ষার নামে আবার যা কিছু করা হচ্ছে তার সবই দরিদ্রদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে যারা নদীভাঙনের শিকার তারাই পাহাড়ের পাদদেশে তোলা ঘরবাড়িতে থাকেন। কেউ তো নিশ্চয়ই শখ করে এমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকে না। আমরা এই জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসিত করতে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। কোর্ট এদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনকে সময় দিয়েছিলেন। প্রশাসন করলো কী, ওখানে ভাড়া নেয়া দরিদ্র লোকগুলোকে সরে যেতে মাইকিং করলো। এখন কথা হলো, যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা কীভাবে সরে যাবেন? প্রশাসন একটা ব্যবস্থা রেখেছিল যেখানে ওরা শুধু গিয়ে থাকতে পারতেন, কিছু করে খেতে পারতেন না। তাই ওরা যাননি। কথা হলো, হাইকোর্ট তো ওদের পুনর্বাসনের কথা বলেছে, উচ্ছেদের কথা বলেনি। ফলে আবার সেই পাহাড়-ধস। এত এত প্রাণহানি।

অনেকেই হয়তো জানেনন না পাহাড়-কাটার জন্য দেশে আইন আছে। নির্দিষ্ট কমিটি আছে। ১৯৮৭ সালে এই আইনটি প্রণীত হওয়ার পর এ পর্যন্ত পাহাড়-কাটার জন্য একটি আবেদনও ওই কমিটিতে জমা পড়েনি। ওদিকে এতগুলো বছরে শত শত পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড় ধসে মাটি-চাপা পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল দেখছি আমরা।

তার মানে যারা পাহাড় কাটেন তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থ অথবা ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটছেন। সেখানে ঘরভাড়া দিচ্ছেন দরিদ্র ভূমিহীন মানুষদের যাদের থাকার কোনও জায়গা নেই বলেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ওই রকম পরিবেশে শিশুদের নিয়ে বসবাস করছেন। আর ওদের প্রাণের ঝুঁকির বিনিময়ে প্রতিপত্তিশালীরা লাখ লাখ টাকা পকেটে পুরছেন। প্রশাসন হয়তো ওদের ভয় পায় অথবা ওদের কাছ থেকে কোনওভাবে বেনিফিটেড হয় বলে চুপ করে থাকে। বরং সময়ে সময়ে ওরা ওই দরিদ্র মানুষগুলোর দরিদ্র ওই পাহাড়ি ঘরের গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। দরিদ্র লোকেরা ঝুঁকি নিয়ে ওখানে টাকা দিয়ে থেকেও আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ হারাচ্ছেন।

দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে ওই প্রতিপত্তিশালী মালিকেরা আদালতে গিয়ে নানাভাবে তাদের পক্ষে আদেশ নিয়ে আসেন। আর প্রশাসন? ওদের কাজটা ছিল এদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া। তা না করে ওরা বরং চুপ করে থাকে।

এভাবেই এখন দেশে আবার পরিবেশ আইনের নামে অত্যাচার হচ্ছে গরিবের ওপরই। আর যারা আসলে পরিবেশ আইনের লঙ্ঘন করছে তারা দিব্যি আছে। তাদের কোনও সমস্যা নেই। পরিবেশ-শাসন ব্যবস্থাটা খুব বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে বলেই আজ দেশের এই অবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই অর্থে কোনও কমিটমেন্ট নেই। যদি থাকত, তাহলে হাজারিবাগের ট্যানারি সরাতে এত সময় লাগত না। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের ব্যাপারে বিধি দিয়েও একে নিয়ন্ত্রণ করতে সময় নষ্ট করা হত না। পাহাড়ে পাহাড়ে এত প্রাণহানি হত না। চারদিকে আবাসন কোম্পানিগুলোর যে অত্যাচার চলছে তা বন্ধ হত। সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রশাসন কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি।

 

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আসলে কী করবেন? তাদের তো বাঁচতে হবে। পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালাতে হবে। তবে পরিবেশ-দুর্বৃত্তরা অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার সুযোগ কম। তাই কমিউিনিটিকে নিজের অধিকারের ব্যাপারে মোবিলাইজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা অধিকার-চর্চার ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিতে হবে। ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ এবং আড়িয়াল বিলে যেভাবে প্রতিরোধ করা গেছে, সেভাবে এদের প্রতিরোধ করতে হবে।চট্টগ্রামে আবার পাহাড়-ধস। আবার মৃত্যুর মিছিল। কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্ত একান্ত নিজেদের স্বার্থে যা করছে তার ফলে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। পাহাড়-কাটার বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এরা পাহাড় কাটছে। তারপর সেখানে ঘর তুলে দরিদ্র-ভূমিহীনদের ভাড়া দিচ্ছে। পরিণতি বর্ষা এলে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়-ধসে ব্যাপক প্রাণহানি। একইভাবে চট্টগ্রামে জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিকরাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। সেখানেও আরেক শ্রেণীর পরিবেশ-দুর্বৃত্তের দাপট।

লক্ষ্য করে দেখুন, গোটা দেশটাই এমন কিছু গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি। এখন ঢাকা শহরে আবাসনের নামে কী হচ্ছে? জলাশয় ভরাট করেও আবাসন হচ্ছে। এখানে যে সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে তার বেনিফিসিয়ারি কারা? বেসরকারি বড়জোর তিন-চারটি আবাসন কোম্পানি। মূলত উচ্চবিত্ত, বড়জোর উচ্চ মধ্যবিত্তদের জন্য এ সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। আমি তো ঢাকা শহরে এমন কোনও উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তের কথা শুনিনি যার কোনও ফ্ল্যাট নেই বলে তিনি রাস্তায় থাকছেন। বরং দরিদ্ররা পথে পথে জীবন কাটাচ্ছেন। নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্তরা ঢাকায় থাকতে না পারলে পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাদের জন্য তো কোনও আবাসন ব্যবস্থা হচ্ছে না। তার মানে, এখানে সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। এটা পরিবেশ ন্যায়বিচারের একটা বড় দিক। এই ন্যায়বিচারের মূল বক্তব্য হল সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে এবং উন্নয়নটা টেকসই হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিলে কেন গণবিস্ফোরণ হলো? জনগণকে আস্থায় নিয়ে কাজটা করার চেষ্টা হয়নি বলে। এলাকার মানুষ চায় না এমন একটা উন্নয়নের মডেল তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। এতে তাদের জীবন এবং জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত। আবার যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তবে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির শিকার হতে থাকে সেখানেও কিন্তু মানুষ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হন। যেমন আদালতে মামলা করেন ইত্যাদি। তবে দেশে যদি সামগ্রিকভাবে পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করা যেত তবে এমনতরো ঘটনাগুলো ঘটত না।

বাস্তব সত্য হলো, আমরা কিন্তু এখন পরিবেশ-শাসনের দিক থেকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। আমাদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও যেন নেই। শিল্প এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা ব্যাপক দূষণের শিকার হচ্ছেন। হাজারিবাগ ট্যানারি কতজন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে? বিপরীতে ওখানকার বর্জ্য দিয়ে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী যে নদীর ওপর নির্ভরশীল পুরো ঢাকা শহরের দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, আহার এবং দৈনন্দিনের কর্মযজ্ঞ।

এখন ঢাকা শহরকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিততম নগরী বলা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের ভ্রান্ত উন্নয়ন কৌশল। আমরা উন্নয়নের জন্য যে মডেল বেছে নিয়েছি তা টেকসই নয়। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি মডেল যাতে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকেও উপকৃত করা যায়। আমাদের বেছে নেয়া মডেলটির ফলে আমাদের খেলার মাঠ চলে গেছে। পার্ক চলে গেছে। আমাদের রাস্তাঘাটে জ্যাম বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে। বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। শব্দদূষণ হচ্ছে ব্যাপক। অর্থাৎ আমাদের মডেলটি উন্নয়নের গতিকে আরও শ্লথ করে দিয়েছে। আমাদের কৈশোরে মনে আছে বনানী থেকে মগবাজারে আমাদের স্কুলে যেতাম দশ মিনিটে। এখন হরতালের দিন ছাড়া অন্য কোনও সময় এত দ্রুত বনানী থেকে মগবাজারে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে এই মডেলটা যে কাজ করেনি সেটাই এর প্রমাণ।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, কোনও কাজই কি হচ্ছে না? হ্যাঁ হচ্ছে। তবে প্রতিপত্তিশালী পরিবেশ-দুর্বৃত্তদের অন্যায়-কাজের তুলনায় তা কিছুই নয়। পরিবেশ বিভাগ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এখন কিছু কিছু পরিবেশ-অন্যায়কারীকে শাস্তি দিচ্ছে বটে কিন্তু এরা আবার আপিলে গিয়ে তা বাতিল করিয়ে নিয়ে আসছে। অনেক সময় দেখা যায় জরিমানা আদায়ের জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া দরকার তা খুব একটা কার্যকর হয় না।

ওদিকে সাধারণ মানুষ কিন্তু পরিবেশ আদালতে যায় না। কারণ পরিবেশ-অন্যায়কারীরা খুব শক্তিশালী। আর উচ্চতর আদালত থেকে আমরা পরিবেশ-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে যে সব মামলার রায় নিয়ে আসছি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই যেমন জাহাজ-ভাঙা শিল্পের কথাই বলছি। এ নিয়ে একটি নাটক চলছে প্রায় আড়াই বছর ধরে। আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সে শিল্পের জন্য সরকারকে একটি বিধিমালা তৈরির কথা বলেছিলেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে দুটো মন্ত্রণালয় থেকে দুটো আলাদা বিধিমালা পাঠানো হয়েছে। এতে আরও কনফিউশন তৈরির সুযোগ হলো। কারণ বিধিমালা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অনুমোদন দেওয়ার নীতি, আন্তর্জাতিক আইন- কোনও দিক থেকেই মিল নেই। তাই হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে বিধি দুটো পাঠানো হয়েছে কোনটি আদালতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা জানানোর জন্য। যতদিন এটা না হচ্ছে ততদিন কিন্তু জাহাজ-ভাঙা শিল্পে আগের মতোই কাজ চলছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছেন।

এই সব অনাচারের কারণে সারা দেশে নদীগুলো দূষিত হয়েই যাচ্ছে। বায়ুদূষণ হচ্ছে। শব্দদূষণ চলছে। সড়কগুলো নিরাপদ করা যায়নি। ঢাকায় যানজট ভয়াবহ। প্রতি বছর নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিক আর পাহাড়ের পাদদেশে থাকা মানুষগুলো মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছেন। আর প্রতিদিন, প্রতিদিনই ভূমিদস্যুরা নদী ও দরিদ্রদের জমি গ্রাস করছে।

তার মানে এ দেশের পরিবেশ-প্রশাসন এখন খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। সমস্যা হলো, পরিবেশ রক্ষার নামে আবার যা কিছু করা হচ্ছে তার সবই দরিদ্রদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে যারা নদীভাঙনের শিকার তারাই পাহাড়ের পাদদেশে তোলা ঘরবাড়িতে থাকেন। কেউ তো নিশ্চয়ই শখ করে এমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকে না। আমরা এই জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসিত করতে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। কোর্ট এদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনকে সময় দিয়েছিলেন। প্রশাসন করলো কী, ওখানে ভাড়া নেয়া দরিদ্র লোকগুলোকে সরে যেতে মাইকিং করলো। এখন কথা হলো, যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা কীভাবে সরে যাবেন? প্রশাসন একটা ব্যবস্থা রেখেছিল যেখানে ওরা শুধু গিয়ে থাকতে পারতেন, কিছু করে খেতে পারতেন না। তাই ওরা যাননি। কথা হলো, হাইকোর্ট তো ওদের পুনর্বাসনের কথা বলেছে, উচ্ছেদের কথা বলেনি। ফলে আবার সেই পাহাড়-ধস। এত এত প্রাণহানি।

অনেকেই হয়তো জানেনন না পাহাড়-কাটার জন্য দেশে আইন আছে। নির্দিষ্ট কমিটি আছে। ১৯৮৭ সালে এই আইনটি প্রণীত হওয়ার পর এ পর্যন্ত পাহাড়-কাটার জন্য একটি আবেদনও ওই কমিটিতে জমা পড়েনি। ওদিকে এতগুলো বছরে শত শত পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড় ধসে মাটি-চাপা পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল দেখছি আমরা।

তার মানে যারা পাহাড় কাটেন তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থ অথবা ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটছেন। সেখানে ঘরভাড়া দিচ্ছেন দরিদ্র ভূমিহীন মানুষদের যাদের থাকার কোনও জায়গা নেই বলেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ওই রকম পরিবেশে শিশুদের নিয়ে বসবাস করছেন। আর ওদের প্রাণের ঝুঁকির বিনিময়ে প্রতিপত্তিশালীরা লাখ লাখ টাকা পকেটে পুরছেন। প্রশাসন হয়তো ওদের ভয় পায় অথবা ওদের কাছ থেকে কোনওভাবে বেনিফিটেড হয় বলে চুপ করে থাকে। বরং সময়ে সময়ে ওরা ওই দরিদ্র মানুষগুলোর দরিদ্র ওই পাহাড়ি ঘরের গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। দরিদ্র লোকেরা ঝুঁকি নিয়ে ওখানে টাকা দিয়ে থেকেও আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ হারাচ্ছেন।

দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে ওই প্রতিপত্তিশালী মালিকেরা আদালতে গিয়ে নানাভাবে তাদের পক্ষে আদেশ নিয়ে আসেন। আর প্রশাসন? ওদের কাজটা ছিল এদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া। তা না করে ওরা বরং চুপ করে থাকে।

এভাবেই এখন দেশে আবার পরিবেশ আইনের নামে অত্যাচার হচ্ছে গরিবের ওপরই। আর যারা আসলে পরিবেশ আইনের লঙ্ঘন করছে তারা দিব্যি আছে। তাদের কোনও সমস্যা নেই। পরিবেশ-শাসন ব্যবস্থাটা খুব বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে বলেই আজ দেশের এই অবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই অর্থে কোনও কমিটমেন্ট নেই। যদি থাকত, তাহলে হাজারিবাগের ট্যানারি সরাতে এত সময় লাগত না। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের ব্যাপারে বিধি দিয়েও একে নিয়ন্ত্রণ করতে সময় নষ্ট করা হত না। পাহাড়ে পাহাড়ে এত প্রাণহানি হত না। চারদিকে আবাসন কোম্পানিগুলোর যে অত্যাচার চলছে তা বন্ধ হত। সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রশাসন কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি।

 

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আসলে কী করবেন? তাদের তো বাঁচতে হবে। পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালাতে হবে। তবে পরিবেশ-দুর্বৃত্তরা অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার সুযোগ কম। তাই কমিউিনিটিকে নিজের অধিকারের ব্যাপারে মোবিলাইজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা অধিকার-চর্চার ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিতে হবে। ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ এবং আড়িয়াল বিলে যেভাবে প্রতিরোধ করা গেছে, সেভাবে এদের প্রতিরোধ করতে হবে।চট্টগ্রামে আবার পাহাড়-ধস। আবার মৃত্যুর মিছিল। কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্ত একান্ত নিজেদের স্বার্থে যা করছে তার ফলে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। পাহাড়-কাটার বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এরা পাহাড় কাটছে। তারপর সেখানে ঘর তুলে দরিদ্র-ভূমিহীনদের ভাড়া দিচ্ছে। পরিণতি বর্ষা এলে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়-ধসে ব্যাপক প্রাণহানি। একইভাবে চট্টগ্রামে জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিকরাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। সেখানেও আরেক শ্রেণীর পরিবেশ-দুর্বৃত্তের দাপট।

লক্ষ্য করে দেখুন, গোটা দেশটাই এমন কিছু গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি। এখন ঢাকা শহরে আবাসনের নামে কী হচ্ছে? জলাশয় ভরাট করেও আবাসন হচ্ছে। এখানে যে সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে তার বেনিফিসিয়ারি কারা? বেসরকারি বড়জোর তিন-চারটি আবাসন কোম্পানি। মূলত উচ্চবিত্ত, বড়জোর উচ্চ মধ্যবিত্তদের জন্য এ সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। আমি তো ঢাকা শহরে এমন কোনও উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তের কথা শুনিনি যার কোনও ফ্ল্যাট নেই বলে তিনি রাস্তায় থাকছেন। বরং দরিদ্ররা পথে পথে জীবন কাটাচ্ছেন। নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্তরা ঢাকায় থাকতে না পারলে পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাদের জন্য তো কোনও আবাসন ব্যবস্থা হচ্ছে না। তার মানে, এখানে সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। এটা পরিবেশ ন্যায়বিচারের একটা বড় দিক। এই ন্যায়বিচারের মূল বক্তব্য হল সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে এবং উন্নয়নটা টেকসই হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিলে কেন গণবিস্ফোরণ হলো? জনগণকে আস্থায় নিয়ে কাজটা করার চেষ্টা হয়নি বলে। এলাকার মানুষ চায় না এমন একটা উন্নয়নের মডেল তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। এতে তাদের জীবন এবং জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত। আবার যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তবে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির শিকার হতে থাকে সেখানেও কিন্তু মানুষ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হন। যেমন আদালতে মামলা করেন ইত্যাদি। তবে দেশে যদি সামগ্রিকভাবে পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করা যেত তবে এমনতরো ঘটনাগুলো ঘটত না।

বাস্তব সত্য হলো, আমরা কিন্তু এখন পরিবেশ-শাসনের দিক থেকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। আমাদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও যেন নেই। শিল্প এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা ব্যাপক দূষণের শিকার হচ্ছেন। হাজারিবাগ ট্যানারি কতজন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে? বিপরীতে ওখানকার বর্জ্য দিয়ে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী যে নদীর ওপর নির্ভরশীল পুরো ঢাকা শহরের দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, আহার এবং দৈনন্দিনের কর্মযজ্ঞ।

এখন ঢাকা শহরকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিততম নগরী বলা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের ভ্রান্ত উন্নয়ন কৌশল। আমরা উন্নয়নের জন্য যে মডেল বেছে নিয়েছি তা টেকসই নয়। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি মডেল যাতে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকেও উপকৃত করা যায়। আমাদের বেছে নেয়া মডেলটির ফলে আমাদের খেলার মাঠ চলে গেছে। পার্ক চলে গেছে। আমাদের রাস্তাঘাটে জ্যাম বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে। বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। শব্দদূষণ হচ্ছে ব্যাপক। অর্থাৎ আমাদের মডেলটি উন্নয়নের গতিকে আরও শ্লথ করে দিয়েছে। আমাদের কৈশোরে মনে আছে বনানী থেকে মগবাজারে আমাদের স্কুলে যেতাম দশ মিনিটে। এখন হরতালের দিন ছাড়া অন্য কোনও সময় এত দ্রুত বনানী থেকে মগবাজারে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে এই মডেলটা যে কাজ করেনি সেটাই এর প্রমাণ।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, কোনও কাজই কি হচ্ছে না? হ্যাঁ হচ্ছে। তবে প্রতিপত্তিশালী পরিবেশ-দুর্বৃত্তদের অন্যায়-কাজের তুলনায় তা কিছুই নয়। পরিবেশ বিভাগ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এখন কিছু কিছু পরিবেশ-অন্যায়কারীকে শাস্তি দিচ্ছে বটে কিন্তু এরা আবার আপিলে গিয়ে তা বাতিল করিয়ে নিয়ে আসছে। অনেক সময় দেখা যায় জরিমানা আদায়ের জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া দরকার তা খুব একটা কার্যকর হয় না।

ওদিকে সাধারণ মানুষ কিন্তু পরিবেশ আদালতে যায় না। কারণ পরিবেশ-অন্যায়কারীরা খুব শক্তিশালী। আর উচ্চতর আদালত থেকে আমরা পরিবেশ-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে যে সব মামলার রায় নিয়ে আসছি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই যেমন জাহাজ-ভাঙা শিল্পের কথাই বলছি। এ নিয়ে একটি নাটক চলছে প্রায় আড়াই বছর ধরে। আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সে শিল্পের জন্য সরকারকে একটি বিধিমালা তৈরির কথা বলেছিলেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে দুটো মন্ত্রণালয় থেকে দুটো আলাদা বিধিমালা পাঠানো হয়েছে। এতে আরও কনফিউশন তৈরির সুযোগ হলো। কারণ বিধিমালা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অনুমোদন দেওয়ার নীতি, আন্তর্জাতিক আইন- কোনও দিক থেকেই মিল নেই। তাই হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে বিধি দুটো পাঠানো হয়েছে কোনটি আদালতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা জানানোর জন্য। যতদিন এটা না হচ্ছে ততদিন কিন্তু জাহাজ-ভাঙা শিল্পে আগের মতোই কাজ চলছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছেন।

এই সব অনাচারের কারণে সারা দেশে নদীগুলো দূষিত হয়েই যাচ্ছে। বায়ুদূষণ হচ্ছে। শব্দদূষণ চলছে। সড়কগুলো নিরাপদ করা যায়নি। ঢাকায় যানজট ভয়াবহ। প্রতি বছর নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিক আর পাহাড়ের পাদদেশে থাকা মানুষগুলো মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছেন। আর প্রতিদিন, প্রতিদিনই ভূমিদস্যুরা নদী ও দরিদ্রদের জমি গ্রাস করছে।

তার মানে এ দেশের পরিবেশ-প্রশাসন এখন খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। সমস্যা হলো, পরিবেশ রক্ষার নামে আবার যা কিছু করা হচ্ছে তার সবই দরিদ্রদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে যারা নদীভাঙনের শিকার তারাই পাহাড়ের পাদদেশে তোলা ঘরবাড়িতে থাকেন। কেউ তো নিশ্চয়ই শখ করে এমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকে না। আমরা এই জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসিত করতে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। কোর্ট এদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনকে সময় দিয়েছিলেন। প্রশাসন করলো কী, ওখানে ভাড়া নেয়া দরিদ্র লোকগুলোকে সরে যেতে মাইকিং করলো। এখন কথা হলো, যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা কীভাবে সরে যাবেন? প্রশাসন একটা ব্যবস্থা রেখেছিল যেখানে ওরা শুধু গিয়ে থাকতে পারতেন, কিছু করে খেতে পারতেন না। তাই ওরা যাননি। কথা হলো, হাইকোর্ট তো ওদের পুনর্বাসনের কথা বলেছে, উচ্ছেদের কথা বলেনি। ফলে আবার সেই পাহাড়-ধস। এত এত প্রাণহানি।

অনেকেই হয়তো জানেনন না পাহাড়-কাটার জন্য দেশে আইন আছে। নির্দিষ্ট কমিটি আছে। ১৯৮৭ সালে এই আইনটি প্রণীত হওয়ার পর এ পর্যন্ত পাহাড়-কাটার জন্য একটি আবেদনও ওই কমিটিতে জমা পড়েনি। ওদিকে এতগুলো বছরে শত শত পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড় ধসে মাটি-চাপা পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল দেখছি আমরা।

তার মানে যারা পাহাড় কাটেন তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থ অথবা ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটছেন। সেখানে ঘরভাড়া দিচ্ছেন দরিদ্র ভূমিহীন মানুষদের যাদের থাকার কোনও জায়গা নেই বলেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ওই রকম পরিবেশে শিশুদের নিয়ে বসবাস করছেন। আর ওদের প্রাণের ঝুঁকির বিনিময়ে প্রতিপত্তিশালীরা লাখ লাখ টাকা পকেটে পুরছেন। প্রশাসন হয়তো ওদের ভয় পায় অথবা ওদের কাছ থেকে কোনওভাবে বেনিফিটেড হয় বলে চুপ করে থাকে। বরং সময়ে সময়ে ওরা ওই দরিদ্র মানুষগুলোর দরিদ্র ওই পাহাড়ি ঘরের গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। দরিদ্র লোকেরা ঝুঁকি নিয়ে ওখানে টাকা দিয়ে থেকেও আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ হারাচ্ছেন।

দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে ওই প্রতিপত্তিশালী মালিকেরা আদালতে গিয়ে নানাভাবে তাদের পক্ষে আদেশ নিয়ে আসেন। আর প্রশাসন? ওদের কাজটা ছিল এদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া। তা না করে ওরা বরং চুপ করে থাকে।

এভাবেই এখন দেশে আবার পরিবেশ আইনের নামে অত্যাচার হচ্ছে গরিবের ওপরই। আর যারা আসলে পরিবেশ আইনের লঙ্ঘন করছে তারা দিব্যি আছে। তাদের কোনও সমস্যা নেই। পরিবেশ-শাসন ব্যবস্থাটা খুব বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে বলেই আজ দেশের এই অবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই অর্থে কোনও কমিটমেন্ট নেই। যদি থাকত, তাহলে হাজারিবাগের ট্যানারি সরাতে এত সময় লাগত না। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের ব্যাপারে বিধি দিয়েও একে নিয়ন্ত্রণ করতে সময় নষ্ট করা হত না। পাহাড়ে পাহাড়ে এত প্রাণহানি হত না। চারদিকে আবাসন কোম্পানিগুলোর যে অত্যাচার চলছে তা বন্ধ হত। সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রশাসন কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি।

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আসলে কী করবেন? তাদের তো বাঁচতে হবে। পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালাতে হবে। তবে পরিবেশ-দুর্বৃত্তরা অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার সুযোগ কম। তাই কমিউিনিটিকে নিজের অধিকারের ব্যাপারে মোবিলাইজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা অধিকার-চর্চার ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিতে হবে। ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ এবং আড়িয়াল বিলে যেভাবে প্রতিরোধ করা গেছে, সেভাবে এদের প্রতিরোধ করতে হবে।চট্টগ্রামে আবার পাহাড়-ধস। আবার মৃত্যুর মিছিল। কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্ত একান্ত নিজেদের স্বার্থে যা করছে তার ফলে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। পাহাড়-কাটার বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এরা পাহাড় কাটছে। তারপর সেখানে ঘর তুলে দরিদ্র-ভূমিহীনদের ভাড়া দিচ্ছে। পরিণতি বর্ষা এলে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়-ধসে ব্যাপক প্রাণহানি। একইভাবে চট্টগ্রামে জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিকরাও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন আর দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। সেখানেও আরেক শ্রেণীর পরিবেশ-দুর্বৃত্তের দাপট।

লক্ষ্য করে দেখুন, গোটা দেশটাই এমন কিছু গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি। এখন ঢাকা শহরে আবাসনের নামে কী হচ্ছে? জলাশয় ভরাট করেও আবাসন হচ্ছে। এখানে যে সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে তার বেনিফিসিয়ারি কারা? বেসরকারি বড়জোর তিন-চারটি আবাসন কোম্পানি। মূলত উচ্চবিত্ত, বড়জোর উচ্চ মধ্যবিত্তদের জন্য এ সব ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। আমি তো ঢাকা শহরে এমন কোনও উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তের কথা শুনিনি যার কোনও ফ্ল্যাট নেই বলে তিনি রাস্তায় থাকছেন। বরং দরিদ্ররা পথে পথে জীবন কাটাচ্ছেন। নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্তরা ঢাকায় থাকতে না পারলে পরিবার-পরিজনকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাদের জন্য তো কোনও আবাসন ব্যবস্থা হচ্ছে না। তার মানে, এখানে সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। এটা পরিবেশ ন্যায়বিচারের একটা বড় দিক। এই ন্যায়বিচারের মূল বক্তব্য হল সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে এবং উন্নয়নটা টেকসই হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ, আড়িয়াল বিলে কেন গণবিস্ফোরণ হলো? জনগণকে আস্থায় নিয়ে কাজটা করার চেষ্টা হয়নি বলে। এলাকার মানুষ চায় না এমন একটা উন্নয়নের মডেল তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। এতে তাদের জীবন এবং জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত। আবার যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না তবে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতির শিকার হতে থাকে সেখানেও কিন্তু মানুষ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হন। যেমন আদালতে মামলা করেন ইত্যাদি। তবে দেশে যদি সামগ্রিকভাবে পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করা যেত তবে এমনতরো ঘটনাগুলো ঘটত না।

বাস্তব সত্য হলো, আমরা কিন্তু এখন পরিবেশ-শাসনের দিক থেকে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। আমাদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও যেন নেই। শিল্প এলাকায় যারা বসবাস করেন তারা ব্যাপক দূষণের শিকার হচ্ছেন। হাজারিবাগ ট্যানারি কতজন মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে? বিপরীতে ওখানকার বর্জ্য দিয়ে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী যে নদীর ওপর নির্ভরশীল পুরো ঢাকা শহরের দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, আহার এবং দৈনন্দিনের কর্মযজ্ঞ।

এখন ঢাকা শহরকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিততম নগরী বলা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো আমাদের ভ্রান্ত উন্নয়ন কৌশল। আমরা উন্নয়নের জন্য যে মডেল বেছে নিয়েছি তা টেকসই নয়। টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি মডেল যাতে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকেও উপকৃত করা যায়। আমাদের বেছে নেয়া মডেলটির ফলে আমাদের খেলার মাঠ চলে গেছে। পার্ক চলে গেছে। আমাদের রাস্তাঘাটে জ্যাম বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে। বায়ুদূষণ মাত্রা ছাড়িয়েছে। শব্দদূষণ হচ্ছে ব্যাপক। অর্থাৎ আমাদের মডেলটি উন্নয়নের গতিকে আরও শ্লথ করে দিয়েছে। আমাদের কৈশোরে মনে আছে বনানী থেকে মগবাজারে আমাদের স্কুলে যেতাম দশ মিনিটে। এখন হরতালের দিন ছাড়া অন্য কোনও সময় এত দ্রুত বনানী থেকে মগবাজারে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে এই মডেলটা যে কাজ করেনি সেটাই এর প্রমাণ।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, কোনও কাজই কি হচ্ছে না? হ্যাঁ হচ্ছে। তবে প্রতিপত্তিশালী পরিবেশ-দুর্বৃত্তদের অন্যায়-কাজের তুলনায় তা কিছুই নয়। পরিবেশ বিভাগ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এখন কিছু কিছু পরিবেশ-অন্যায়কারীকে শাস্তি দিচ্ছে বটে কিন্তু এরা আবার আপিলে গিয়ে তা বাতিল করিয়ে নিয়ে আসছে। অনেক সময় দেখা যায় জরিমানা আদায়ের জন্য যে আইনি প্রক্রিয়া দরকার তা খুব একটা কার্যকর হয় না।

ওদিকে সাধারণ মানুষ কিন্তু পরিবেশ আদালতে যায় না। কারণ পরিবেশ-অন্যায়কারীরা খুব শক্তিশালী। আর উচ্চতর আদালত থেকে আমরা পরিবেশ-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে যে সব মামলার রায় নিয়ে আসছি সেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এই যেমন জাহাজ-ভাঙা শিল্পের কথাই বলছি। এ নিয়ে একটি নাটক চলছে প্রায় আড়াই বছর ধরে। আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সে শিল্পের জন্য সরকারকে একটি বিধিমালা তৈরির কথা বলেছিলেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে দুটো মন্ত্রণালয় থেকে দুটো আলাদা বিধিমালা পাঠানো হয়েছে। এতে আরও কনফিউশন তৈরির সুযোগ হলো। কারণ বিধিমালা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অনুমোদন দেওয়ার নীতি, আন্তর্জাতিক আইন- কোনও দিক থেকেই মিল নেই। তাই হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে বিধি দুটো পাঠানো হয়েছে কোনটি আদালতের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ তা জানানোর জন্য। যতদিন এটা না হচ্ছে ততদিন কিন্তু জাহাজ-ভাঙা শিল্পে আগের মতোই কাজ চলছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করে যাচ্ছেন।

এই সব অনাচারের কারণে সারা দেশে নদীগুলো দূষিত হয়েই যাচ্ছে। বায়ুদূষণ হচ্ছে। শব্দদূষণ চলছে। সড়কগুলো নিরাপদ করা যায়নি। ঢাকায় যানজট ভয়াবহ। প্রতি বছর নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের শ্রমিক আর পাহাড়ের পাদদেশে থাকা মানুষগুলো মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছেন। আর প্রতিদিন, প্রতিদিনই ভূমিদস্যুরা নদী ও দরিদ্রদের জমি গ্রাস করছে।

তার মানে এ দেশের পরিবেশ-প্রশাসন এখন খুবই নাজুক অবস্থায় আছে। সমস্যা হলো, পরিবেশ রক্ষার নামে আবার যা কিছু করা হচ্ছে তার সবই দরিদ্রদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে যারা নদীভাঙনের শিকার তারাই পাহাড়ের পাদদেশে তোলা ঘরবাড়িতে থাকেন। কেউ তো নিশ্চয়ই শখ করে এমন একটা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকে না। আমরা এই জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসিত করতে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। কোর্ট এদের পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনকে সময় দিয়েছিলেন। প্রশাসন করলো কী, ওখানে ভাড়া নেয়া দরিদ্র লোকগুলোকে সরে যেতে মাইকিং করলো। এখন কথা হলো, যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা কীভাবে সরে যাবেন? প্রশাসন একটা ব্যবস্থা রেখেছিল যেখানে ওরা শুধু গিয়ে থাকতে পারতেন, কিছু করে খেতে পারতেন না। তাই ওরা যাননি। কথা হলো, হাইকোর্ট তো ওদের পুনর্বাসনের কথা বলেছে, উচ্ছেদের কথা বলেনি। ফলে আবার সেই পাহাড়-ধস। এত এত প্রাণহানি।

অনেকেই হয়তো জানেনন না পাহাড়-কাটার জন্য দেশে আইন আছে। নির্দিষ্ট কমিটি আছে। ১৯৮৭ সালে এই আইনটি প্রণীত হওয়ার পর এ পর্যন্ত পাহাড়-কাটার জন্য একটি আবেদনও ওই কমিটিতে জমা পড়েনি। ওদিকে এতগুলো বছরে শত শত পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড় ধসে মাটি-চাপা পড়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল দেখছি আমরা।

তার মানে যারা পাহাড় কাটেন তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থ অথবা ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে পাহাড় কাটছেন। সেখানে ঘরভাড়া দিচ্ছেন দরিদ্র ভূমিহীন মানুষদের যাদের থাকার কোনও জায়গা নেই বলেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ওই রকম পরিবেশে শিশুদের নিয়ে বসবাস করছেন। আর ওদের প্রাণের ঝুঁকির বিনিময়ে প্রতিপত্তিশালীরা লাখ লাখ টাকা পকেটে পুরছেন। প্রশাসন হয়তো ওদের ভয় পায় অথবা ওদের কাছ থেকে কোনওভাবে বেনিফিটেড হয় বলে চুপ করে থাকে। বরং সময়ে সময়ে ওরা ওই দরিদ্র মানুষগুলোর দরিদ্র ওই পাহাড়ি ঘরের গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয়। দরিদ্র লোকেরা ঝুঁকি নিয়ে ওখানে টাকা দিয়ে থেকেও আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ হারাচ্ছেন।

দেখা যায়, এসব ক্ষেত্রে ওই প্রতিপত্তিশালী মালিকেরা আদালতে গিয়ে নানাভাবে তাদের পক্ষে আদেশ নিয়ে আসেন। আর প্রশাসন? ওদের কাজটা ছিল এদের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া। তা না করে ওরা বরং চুপ করে থাকে।

এভাবেই এখন দেশে আবার পরিবেশ আইনের নামে অত্যাচার হচ্ছে গরিবের ওপরই। আর যারা আসলে পরিবেশ আইনের লঙ্ঘন করছে তারা দিব্যি আছে। তাদের কোনও সমস্যা নেই। পরিবেশ-শাসন ব্যবস্থাটা খুব বেশি নাজুক হয়ে পড়েছে বলেই আজ দেশের এই অবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলোরও সেই অর্থে কোনও কমিটমেন্ট নেই। যদি থাকত, তাহলে হাজারিবাগের ট্যানারি সরাতে এত সময় লাগত না। জাহাজ-ভাঙা শিল্পের ব্যাপারে বিধি দিয়েও একে নিয়ন্ত্রণ করতে সময় নষ্ট করা হত না। পাহাড়ে পাহাড়ে এত প্রাণহানি হত না। চারদিকে আবাসন কোম্পানিগুলোর যে অত্যাচার চলছে তা বন্ধ হত। সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রশাসন কিছু পরিবেশ-দুর্বৃত্তের হাতে জিম্মি।

 

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আসলে কী করবেন? তাদের তো বাঁচতে হবে। পরিবেশ-সুশাসন নিশ্চিত করতে আইনি লড়াই চালাতে হবে। তবে পরিবেশ-দুর্বৃত্তরা অনেক শক্তিশালী। তাদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার সুযোগ কম। তাই কমিউিনিটিকে নিজের অধিকারের ব্যাপারে মোবিলাইজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা অধিকার-চর্চার ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিতে হবে। ফুলবাড়ি, রূপগঞ্জ এবং আড়িয়াল বিলে যেভাবে প্রতিরোধ করা গেছে, সেভাবে এদের প্রতিরোধ করতে হবে।

Comments

comments