ব্রেকিং নিউজ

মধ্যপ্রাচ্চে খৃষ্টীয়ানদের ক্রুসেডের যুদ্ধ

indexবিডি এক্সপ্রেসঃ হযরত ওমরের (রা.) খেলাফত কালে (৬৩৭ খৃ:) জেরুজালেম মুসলমানদের দখলে আসে। বিজয় যখন মুসলমানদের আয়ত্তে তখন জেরুজালেমের অধিপতি পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনাস আবেদন করেন যে তাদের আত্মসমর্পণ স্বয়ং খলিফার উপস্থিতিতেই হতে হবে এবং খলিফাকেই তাদের দাবি দাওয়ার কথা শুনতে হবে। তার এই আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ওমর (রা.) জেরুজালেমে পৌঁছেন। তার পরের দিন ফজরের সময় হযরত বিলাল (রা) কে আজান দিতে আহবান করেন। নবী (সা.)এঁর ওফাতের পর থেকে বিলাল (রা.) আর আজান দিচ্ছিলেন না। কিন্তু এই মহান মূহুর্ত্তে খলিফার আবেদনে যখন দাড়িয়ে যান এবং আজান দেন তখন সাহাবীরা (রা.) কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। এই স্বরের সাথে কত স্মৃতি, কত ইতিহাস, কত আবেগ।
সকাল বেলায় আবু ওবায়দা (রা.) কে তাঁর আগমন সংবাদ সফ্রোনাসকে দিতে বলেন। তাই করা হল। কিন্তু এক পর্যায়ে সফ্রোনাসের সাথে যখন কেবল আবু ওবায়দাকে (রা.) নিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছেন তখন তাঁর সাথিরা বললেন, আমিরুল মু’মিনীন আপনি বিনা নিরাপত্তায় যাচ্ছেন, আমাদের ভয় হয় যে যদি তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে, অথচ আপনার সাথে নিরাপত্তার কিছু নেই। ওমর (রা.) পাঠ করলেন, قُل لَّن يُصِيبَنَآ إِلاَّ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلاَنَا وَعَلَى ٱللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ ٱلْمُؤْمِنُونَ -বলুন, আমাদেরকে কোন মুসীবত আক্রান্ত করতে পারবে না কেবল তা ব্যতীত যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন; তিনি আমাদের প্রভু, আমাদের নির্বাহক। সুতরাং বিশ্বাসীরা কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা উচিত (৯:৫১)।
অতঃপর ওমর (রা.) পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনাসের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাদের জানমাল ও ধর্মীয় নিরাপত্তার বিষয়াদি নিশ্চিত করেন। সেই হতে জেরুজালেমে সকল ধর্মের (ইয়াহুদী/খৃষ্টীয়ান) লোকজনের যাওয়া আসা, ইবাদত-আরাধনার নিরাপত্তা বিধিত হয় এবং এটা এভাবেই যুগপৎ হয়ে পড়ে।
প্রথম ক্রুসেড
এগারো শতাব্দীতে ইউরোপিয়ান শাসকেরা ধর্মীয় এবং বাণিজ্যিক অভিপ্রায়ে জেরুজালেমকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিতে পরিকল্পনা শুরু করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করেন -তা ছোট বড় আকারে ১৩ শো শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে। তাদের যুদ্ধ ও দখলদারিতে প্রাণহাণী ঘটান, নানান রকমের অত্যাচার ও নির্যাতন করেন এবং সর্বোপরি যুদ্ধের অর্থ সংগ্রহ করতে এবং সৈন্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে যে চরম মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা করেন তার জের এখনও শেষ হয় নি। ইউরোপ ও মুসলমানদের মধ্যে হাজার বৎসরের টানাপোড়নের সম্পর্ক এই যুদ্ধংদেহী তৎপরতার সৃষ্টি।
১০৬০ এর দশকে সেলজুক (মুসলিম) তুর্কীদের হাতে জেরুজালেমের কর্তৃত্ব চলে গেলে পশ্চিমা দেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, কেননা যেকোনো পটপরিবর্তনে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের অবকাশ দেখা দেয়। কিন্তু এই পরিবর্তন সাধারণ ছিল না, এটা ইউরোপিয়ানদের সামনে যুদ্ধের একটি অজুহাত খাড়া করে দেয়। ১০৯৫ সালে বুউয়েঁর গডফ্রি (Godfrey of Bouillon, একজন ফরাসী) সসৈন্যে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। ১০৯৯ সালে মুসলমানদেরকে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম তাদের দখলে আনেন। এই যুদ্ধে গোটা ক্যাথোলিক চার্চ ও পোপ ২য় আর্বানের (১০৩৫-১০৯৯) সমর্থন ও আশীর্বাদ ছিল।
বিজয়ের পর ক্রুসেড খৃষ্টীয়ানরা যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বহান। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। [১] শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খোর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।
বিজয় ধরে রাখা, পরবর্তী যুদ্ধাদি চালিয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে গডফ্রি জেরুজালেমের বাদশার পদে সমাসীন হন।
দ্বিতীয় ক্রুসেড
ক্রুসেডের যুদ্ধ কয়েক দফা হয়েছিল। জেরুজালেম ক্রুসেডদের দখলে থাকা অবস্থায় তারা সেখান থেকে অপরাপর স্থান দখল করার জন্যও যুদ্ধ করে। তাছাড়া ইউরোপ থেকে এই উদ্দেশ্যে আরও যুদ্ধাদি নিয়ে যাওয়া হয়। এগুলোর সবই ক্রুসেডের যুদ্ধ, ধর্মের যুদ্ধ।
একজন ফরাসী এবোট বার্নার্ড অব ক্লেয়ারভক্স (Bernard of Clairvaux) এর আহবানে বাদশাহ ৭ম লুইস ও ৩য় কনরাডের অধীনের একটি ক্রুসেড ১১৪৭ থেকে ১১৪৯ পর্যন্ত চালানো হয়। কিন্তু তারা এই অভিযানে তেমন কোন ফায়দা হাসিল করতে পারেননি। [উইকি, ৩] সালাউদ্দীন আইয়ূবীর জেরুজালেম উদ্ধার
সালাউদ্দীনের সাথে ক্রুসেড খৃষ্টীয়ানরা যুদ্ধ হয় ১১৮৭ সালে। এর কয়েক দশক আগে অপর এক ক্রুসেড যুদ্ধে এই মর্মে বিরতি (truce) আসে যে খৃষ্টীয়ানরা মুসলমানদেরকে হজ্জে যাতায়াতে বাধা দেবে না, ব্যবসায় কাফেলাদেরকে এবং ধর্মীয় কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টি করবেনা। এটাই প্রায় চার যুগ ধরে চলছিল। কিন্তু ১১৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে একটি হজ্জযাত্রী কাফেলাকে রেনোল্ড (Raynald) আক্রমণ করেন, মালামাল লুট করেন এবং তাদেরকে মারধর করে জেলে নিক্ষেপ করেন। রেনোল্ডের উদ্দেশ্য ছিল সালাউদ্দীনকে যুদ্ধে নামানো। অবস্থা এই ছিল যে জেরুজালেমের বাদশাহ বল্ডউইন কোষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে তার ভায়রা (brother in-law) গী অব লুসিগনান (Guy of Lusingnan) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন, (made him a regent)। কিন্তু গীর সে ধরনের তেমন কোন দক্ষতা ছিল না। তাই তার এক প্রাক্তন-মৈত্রী রেনোল্ড তার কাজে সহায়তা করতেন এবং ‘সুযোগও গ্রহণ করতেন’। [উইকি, ৪]। রেনোল্ড একজন রক্ত-লিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন। [প্রাগুক্ত, নোট ১] । তবে রেনোল্ড কর্তৃক ব্যবসায় কাফেলাকে ইতিপূর্বে হয়রানী করার অভিযোগও আছে।
পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানদের ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাই রেনোল্ড ইচ্ছে করেই সালাউদ্দীনকে যুদ্ধে নামিয়ে চূর্ণ করার পরিকল্পনা করেন। এই উদ্দেশেই একটি নিরপরাধ, নিরস্ত্র, হজ্জগামী কাফেলাকে আক্রমণ। এরই জওয়াব দিতে আসেন সালাউদ্দীন আইয়ূবী। ১১৮৭ সালে তিনি ক্রুসেডদেরকে দারুণভাবে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। তাঁর জেরুজালেমে প্রবেশ ও বিজয় ছিল রক্তহীন।
তৃতীয় ক্রুসেড
সালাউদ্দীনের বিজয় ইউরোপে তুমুল ক্ষোভ ও বিকম্পন সৃষ্টি করে। পোপ ৩য় আর্বান হার্ট এটাক করে মারা যান। স্মরণ রাখা দরকার যে ১০৯৯ সালে যখন জেরুজালেম ক্রুসেডরা দখল করে তখন পোপ ২য় আর্বানের মৃত্যু হয়। পোপ ৭ম গ্রিগোরি পালটা ক্রুসেড নিয়ে যাওয়ার জন্য আহবান করেন। জার্মানের ১ম ফ্রেড্রিক বারোসা, ফ্রান্সের ২য় ফিলিপস অগাস্টাস এক বিরাট বাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেন। পথে কোনো এক নদীতে ফ্রেড্রিক ডুবে মরেন। কুলক্ষণ ভেবে বা নিরাশ হয়ে তারা যাত্রা ভঙ্গ করেন।
১১৮৯ সালে ইংল্যান্ডের বাদশাহ তৃতীয় রিচার্ড সেকালের সবচেয়ে ভারী অস্ত্র ও কামান সহ ১৭,০০০ সৈন্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। (প্রাগুক্ত, নোট ১) গন্তব্যস্থলে পৌঁছিলে তার সাথে সিভিলিয়ান হয়ে থাকা ও পলাতক ক্রুসেডরা শরিক হন। তাছাড়া সেই অঞ্চলের খৃষ্টিয়ান সৈন্যরা যারা আগে বল্ডউন ও গীর অধীনে ছিল –তারাও সংঘবদ্ধ হন। অপরদিকে সালাউদ্দীনের সৈন্য সংখ্যা দিন দিন কমে আসছিল, কেননা তার লোকজন ছিল জেহাদ করতে আসা নানান অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ –যারা পরিবার পরিজন ও ক্ষেত-খামার রেখে বৎসরের পর বৎসর লেগে থাকার মত অবস্থানে ছিল না।
রিচার্ড বিপুল শক্তিতে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি একর, জাফা, কেসারিয়া এবং টায়ার –এই শহরগুলো মুসলমানদেরকে পরাজিত করে নিজ দখলে নেন। দু এক শহরে তুমুল যুদ্ধে কখন এই পক্ষ কখন সেই পক্ষ বিজয় লাভ করতে থাকে।
কিন্তু রিচার্ড প্রথমে একর দখল করেই সেখানে যুদ্ধাপরাধ করেন। তার হাতে ২,৭০০ মুসলিম সৈন্য ধরা পড়লে তিনি কয়েক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিয়ে মুক্তিপণে ফিরৎ দিতে রাজি হন। কিন্তু স্বর্ণ হস্তান্তর ও সৈন্য ফিরৎ পাওয়া প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে খানিক দেরি হলে তিনি সকল সৈন্যদেরে সারিবদ্ধ করে শিরচ্ছেন করেন। [প্রাগুক্ত, নোট ১] অনেক তুমুল যুদ্ধের পর ১১৯২ সালে উল্লেখিত শহরগুলো তার কর্তৃত্বে রেখে এবং জেরুজালেম আক্রমণ না করেই রিচার্ড ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। রিচার্ড তখন আহত ছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি জেরুজালেম বিজয় করতে পারবেন বলে মনে করেননি অথবা বিজয় করলেও তা ধরে রাখতে পারবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন না। পরবর্তী বৎসর সালাদ্দিনের মৃত্যু হয়। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ক্রুসেডদের অনুশোচনা ছিল যে রিচার্ড যদি কোনো রকমে আরও একটি বৎসর থেকে যেতে পারতেন তবে সালাউদ্দীনের মৃত্যুতে তার উত্তরাধিকার নিয়ে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার সুযোগে জেরুজালেম আক্রমণ করা যেত এবং হয়ত বিজয় আসত। ইংল্যান্ড ফেরার কয়েক বৎসর পর অর্থাৎ ১১৯৯ সালে রিচার্ড মারা যান) ।
অন্যান্য ক্রুসেড
রিচার্ডের ইচ্ছে ছিল তিনি আরেক দফা অভিযান চালাবেন। কিন্তু জেরুজালেমে আহত হবার পর সে ক্ষতস্থান আর পুরোপুরি ভাল নি বরং সেই ক্ষত থেকেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে ক্রুসেড যুদ্ধ থেমে যায়নি। এই যুদ্ধ তার পরের একশো বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু ক্রুসেডরা জেরুজালেম দখল করতে সমর্থ হননি। ছোট বড় যুদ্ধ হয়, তাদের মধ্যে হচ্ছে ১২০২-৪ সালে, ১২১২-২১ সালে, ১২২৮-২৯ সালে, ১২৪৯-৫৪ সালে, ১২৭০-৭২ সালে, ও ১২৯১ সালে। [৫] শেষ কথা
ক্রুসেডের যুদ্ধগুলি মুসলিম ভূখণ্ডে অনেক বিপর্যয় এনেছে, অনেক প্রাণনাশ করেছে, তাদের জাতীয় জীবনে ও মানসিকতায় অনেক প্রভাব ফেলেছে। এই কথাটি আবার ইউরোপের ব্যাপারেও সত্য। দুই শো বৎসর ব্যাপী চালিত এই যুদ্ধ ইউরোপের রাজনীতি, সমাজ ও মনন জুড়ে রেখেছিল। যুদ্ধের জন্য বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ জনগণ স্বহস্তে ধন-সম্পদ দান করেছিল, যুদ্ধে গিয়ে জীবন দিয়েছিল, জীবন নিয়েছিল –এই যুদ্ধ তাই মামুলী ছিল না, হতেই পারত না।
বিজয়ের পর ক্রুসেড যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বহান। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। [১] শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খোর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।হযরত ওমরের (রা.) খেলাফত কালে (৬৩৭ খৃ:) জেরুজালেম মুসলমানদের দখলে আসে। বিজয় যখন মুসলমানদের আয়ত্তে তখন জেরুজালেমের অধিপতি পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনাস (Patriarch Sophronius) আবেদন করেন যে তাদের আত্মসমর্পণ স্বয়ং খলিফার উপস্থিতিতেই হতে হবে এবং খলিফাকেই তাদের দাবি দাওয়ার কথা শুনতে হবে। তার এই আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ওমর (রা.) জেরুজালেমে পৌঁছেন। তার পরের দিন ফজরের সময় হযরত বিলাল (রা) কে আজান দিতে আহবান করেন। নবী (সা.)এঁর ওফাতের পর থেকে বিলাল (রা.) আর আজান দিচ্ছিলেন না। কিন্তু এই মহান মূহুর্ত্তে খলিফার আবেদনে যখন দাড়িয়ে যান এবং আজান দেন তখন সাহাবীরা (রা.) কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। এই স্বরের সাথে কত স্মৃতি, কত ইতিহাস, কত আবেগ।
সকাল বেলায় আবু ওবায়দা (রা.) কে তাঁর আগমন সংবাদ সফ্রোনাসকে দিতে বলেন। তাই করা হল। কিন্তু এক পর্যায়ে সফ্রোনাসের সাথে যখন কেবল আবু ওবায়দাকে (রা.) নিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছেন তখন তাঁর সাথিরা বললেন, আমিরুল মু’মিনীন আপনি বিনা নিরাপত্তায় যাচ্ছেন, আমাদের ভয় হয় যে যদি তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে, অথচ আপনার সাথে নিরাপত্তার কিছু নেই। ওমর (রা.) পাঠ করলেন, قُل لَّن يُصِيبَنَآ إِلاَّ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلاَنَا وَعَلَى ٱللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ ٱلْمُؤْمِنُونَ -বলুন, আমাদেরকে কোন মুসীবত আক্রান্ত করতে পারবে না কেবল তা ব্যতীত যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন; তিনি আমাদের প্রভু, আমাদের নির্বাহক। সুতরাং বিশ্বাসীরা কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা উচিত (৯:৫১)।
অতঃপর ওমর (রা.) পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনাসের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাদের জানমাল ও ধর্মীয় নিরাপত্তার বিষয়াদি নিশ্চিত করেন। সেই হতে জেরুজালেমে সকল ধর্মের (ইয়াহুদী/খৃষ্টীয়ান) লোকজনের যাওয়া আসা, ইবাদত-আরাধনার নিরাপত্তা বিধিত হয় এবং এটা এভাবেই যুগপৎ হয়ে পড়ে।
প্রথম ক্রুসেড
এগারো শতাব্দীতে ইউরোপিয়ান শাসকেরা ধর্মীয় এবং বাণিজ্যিক অভিপ্রায়ে জেরুজালেমকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিতে পরিকল্পনা শুরু করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করেন -তা ছোট বড় আকারে ১৩ শো শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে। তাদের যুদ্ধ ও দখলদারিতে প্রাণহাণী ঘটান, নানান রকমের অত্যাচার ও নির্যাতন করেন এবং সর্বোপরি যুদ্ধের অর্থ সংগ্রহ করতে এবং সৈন্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে যে চরম মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা করেন তার জের এখনও শেষ হয় নি। ইউরোপ ও মুসলমানদের মধ্যে হাজার বৎসরের টানাপোড়নের সম্পর্ক এই যুদ্ধংদেহী তৎপরতার সৃষ্টি।
১০৬০ এর দশকে সেলজুক (মুসলিম) তুর্কীদের হাতে জেরুজালেমের কর্তৃত্ব চলে গেলে পশ্চিমা দেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, কেননা যেকোনো পটপরিবর্তনে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের অবকাশ দেখা দেয়। কিন্তু এই পরিবর্তন সাধারণ ছিল না, এটা ইউরোপিয়ানদের সামনে যুদ্ধের একটি অজুহাত খাড়া করে দেয়। ১০৯৫ সালে বুউয়েঁর গডফ্রি (Godfrey of Bouillon, একজন ফরাসী) সসৈন্যে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। ১০৯৯ সালে মুসলমানদেরকে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম তাদের দখলে আনেন। এই যুদ্ধে গোটা ক্যাথোলিক চার্চ ও পোপ ২য় আর্বানের (১০৩৫-১০৯৯) সমর্থন ও আশীর্বাদ ছিল।
বিজয়ের পর ক্রুসেড খৃষ্টীয়ানরা যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বহান। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। [১] শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খোর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।
বিজয় ধরে রাখা, পরবর্তী যুদ্ধাদি চালিয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে গডফ্রি জেরুজালেমের বাদশার পদে সমাসীন হন।
দ্বিতীয় ক্রুসেড
ক্রুসেডের যুদ্ধ কয়েক দফা হয়েছিল। জেরুজালেম ক্রুসেডদের দখলে থাকা অবস্থায় তারা সেখান থেকে অপরাপর স্থান দখল করার জন্যও যুদ্ধ করে। তাছাড়া ইউরোপ থেকে এই উদ্দেশ্যে আরও যুদ্ধাদি নিয়ে যাওয়া হয়। এগুলোর সবই ক্রুসেডের যুদ্ধ, ধর্মের যুদ্ধ।
একজন ফরাসী এবোট বার্নার্ড অব ক্লেয়ারভক্স (Bernard of Clairvaux) এর আহবানে বাদশাহ ৭ম লুইস ও ৩য় কনরাডের অধীনের একটি ক্রুসেড ১১৪৭ থেকে ১১৪৯ পর্যন্ত চালানো হয়। কিন্তু তারা এই অভিযানে তেমন কোন ফায়দা হাসিল করতে পারেননি। [উইকি, ৩] সালাউদ্দীন আইয়ূবীর জেরুজালেম উদ্ধার
সালাউদ্দীনের সাথে ক্রুসেড খৃষ্টীয়ানরা যুদ্ধ হয় ১১৮৭ সালে। এর কয়েক দশক আগে অপর এক ক্রুসেড যুদ্ধে এই মর্মে বিরতি (truce) আসে যে খৃষ্টীয়ানরা মুসলমানদেরকে হজ্জে যাতায়াতে বাধা দেবে না, ব্যবসায় কাফেলাদেরকে এবং ধর্মীয় কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টি করবেনা। এটাই প্রায় চার যুগ ধরে চলছিল। কিন্তু ১১৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে একটি হজ্জযাত্রী কাফেলাকে রেনোল্ড (Raynald) আক্রমণ করেন, মালামাল লুট করেন এবং তাদেরকে মারধর করে জেলে নিক্ষেপ করেন। রেনোল্ডের উদ্দেশ্য ছিল সালাউদ্দীনকে যুদ্ধে নামানো। অবস্থা এই ছিল যে জেরুজালেমের বাদশাহ বল্ডউইন কোষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে তার ভায়রা (brother in-law) গী অব লুসিগনান (Guy of Lusingnan) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন, (made him a regent)। কিন্তু গীর সে ধরনের তেমন কোন দক্ষতা ছিল না। তাই তার এক প্রাক্তন-মৈত্রী রেনোল্ড তার কাজে সহায়তা করতেন এবং ‘সুযোগও গ্রহণ করতেন’। [উইকি, ৪]। রেনোল্ড একজন রক্ত-লিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন। [প্রাগুক্ত, নোট ১] । তবে রেনোল্ড কর্তৃক ব্যবসায় কাফেলাকে ইতিপূর্বে হয়রানী করার অভিযোগও আছে।
পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানদের ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাই রেনোল্ড ইচ্ছে করেই সালাউদ্দীনকে যুদ্ধে নামিয়ে চূর্ণ করার পরিকল্পনা করেন। এই উদ্দেশেই একটি নিরপরাধ, নিরস্ত্র, হজ্জগামী কাফেলাকে আক্রমণ। এরই জওয়াব দিতে আসেন সালাউদ্দীন আইয়ূবী। ১১৮৭ সালে তিনি ক্রুসেডদেরকে দারুণভাবে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। তাঁর জেরুজালেমে প্রবেশ ও বিজয় ছিল রক্তহীন।
তৃতীয় ক্রুসেড
সালাউদ্দীনের বিজয় ইউরোপে তুমুল ক্ষোভ ও বিকম্পন সৃষ্টি করে। পোপ ৩য় আর্বান হার্ট এটাক করে মারা যান। স্মরণ রাখা দরকার যে ১০৯৯ সালে যখন জেরুজালেম ক্রুসেডরা দখল করে তখন পোপ ২য় আর্বানের মৃত্যু হয়। পোপ ৭ম গ্রিগোরি পালটা ক্রুসেড নিয়ে যাওয়ার জন্য আহবান করেন। জার্মানের ১ম ফ্রেড্রিক বারোসা, ফ্রান্সের ২য় ফিলিপস অগাস্টাস এক বিরাট বাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেন। পথে কোনো এক নদীতে ফ্রেড্রিক ডুবে মরেন। কুলক্ষণ ভেবে বা নিরাশ হয়ে তারা যাত্রা ভঙ্গ করেন।
১১৮৯ সালে ইংল্যান্ডের বাদশাহ তৃতীয় রিচার্ড সেকালের সবচেয়ে ভারী অস্ত্র ও কামান সহ ১৭,০০০ সৈন্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। (প্রাগুক্ত, নোট ১) গন্তব্যস্থলে পৌঁছিলে তার সাথে সিভিলিয়ান হয়ে থাকা ও পলাতক ক্রুসেডরা শরিক হন। তাছাড়া সেই অঞ্চলের খৃষ্টিয়ান সৈন্যরা যারা আগে বল্ডউন ও গীর অধীনে ছিল –তারাও সংঘবদ্ধ হন। অপরদিকে সালাউদ্দীনের সৈন্য সংখ্যা দিন দিন কমে আসছিল, কেননা তার লোকজন ছিল জেহাদ করতে আসা নানান অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ –যারা পরিবার পরিজন ও ক্ষেত-খামার রেখে বৎসরের পর বৎসর লেগে থাকার মত অবস্থানে ছিল না।
রিচার্ড বিপুল শক্তিতে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি একর, জাফা, কেসারিয়া এবং টায়ার –এই শহরগুলো মুসলমানদেরকে পরাজিত করে নিজ দখলে নেন। দু এক শহরে তুমুল যুদ্ধে কখন এই পক্ষ কখন সেই পক্ষ বিজয় লাভ করতে থাকে।
কিন্তু রিচার্ড প্রথমে একর দখল করেই সেখানে যুদ্ধাপরাধ করেন। তার হাতে ২,৭০০ মুসলিম সৈন্য ধরা পড়লে তিনি কয়েক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিয়ে মুক্তিপণে ফিরৎ দিতে রাজি হন। কিন্তু স্বর্ণ হস্তান্তর ও সৈন্য ফিরৎ পাওয়া প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে খানিক দেরি হলে তিনি সকল সৈন্যদেরে সারিবদ্ধ করে শিরচ্ছেন করেন। [প্রাগুক্ত, নোট ১] অনেক তুমুল যুদ্ধের পর ১১৯২ সালে উল্লেখিত শহরগুলো তার কর্তৃত্বে রেখে এবং জেরুজালেম আক্রমণ না করেই রিচার্ড ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। রিচার্ড তখন আহত ছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি জেরুজালেম বিজয় করতে পারবেন বলে মনে করেননি অথবা বিজয় করলেও তা ধরে রাখতে পারবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন না। পরবর্তী বৎসর সালাদ্দিনের মৃত্যু হয়। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ক্রুসেডদের অনুশোচনা ছিল যে রিচার্ড যদি কোনো রকমে আরও একটি বৎসর থেকে যেতে পারতেন তবে সালাউদ্দীনের মৃত্যুতে তার উত্তরাধিকার নিয়ে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার সুযোগে জেরুজালেম আক্রমণ করা যেত এবং হয়ত বিজয় আসত। ইংল্যান্ড ফেরার কয়েক বৎসর পর অর্থাৎ ১১৯৯ সালে রিচার্ড মারা যান) ।
অন্যান্য ক্রুসেড
রিচার্ডের ইচ্ছে ছিল তিনি আরেক দফা অভিযান চালাবেন। কিন্তু জেরুজালেমে আহত হবার পর সে ক্ষতস্থান আর পুরোপুরি ভাল নি বরং সেই ক্ষত থেকেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে ক্রুসেড যুদ্ধ থেমে যায়নি। এই যুদ্ধ তার পরের একশো বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু ক্রুসেডরা জেরুজালেম দখল করতে সমর্থ হননি। ছোট বড় যুদ্ধ হয়, তাদের মধ্যে হচ্ছে ১২০২-৪ সালে, ১২১২-২১ সালে, ১২২৮-২৯ সালে, ১২৪৯-৫৪ সালে, ১২৭০-৭২ সালে, ও ১২৯১ সালে। [৫] শেষ কথা
ক্রুসেডের যুদ্ধগুলি মুসলিম ভূখণ্ডে অনেক বিপর্যয় এনেছে, অনেক প্রাণনাশ করেছে, তাদের জাতীয় জীবনে ও মানসিকতায় অনেক প্রভাব ফেলেছে। এই কথাটি আবার ইউরোপের ব্যাপারেও সত্য। দুই শো বৎসর ব্যাপী চালিত এই যুদ্ধ ইউরোপের রাজনীতি, সমাজ ও মনন জুড়ে রেখেছিল। যুদ্ধের জন্য বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ জনগণ স্বহস্তে ধন-সম্পদ দান করেছিল, যুদ্ধে গিয়ে জীবন দিয়েছিল, জীবন নিয়েছিল –এই যুদ্ধ তাই মামুলী ছিল না, হতেই পারত না।
বিজয়ের পর ক্রুসেড যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বহান। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। [১] শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খোর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।হযরত ওমরের (রা.) খেলাফত কালে (৬৩৭ খৃ:) জেরুজালেম মুসলমানদের দখলে আসে। বিজয় যখন মুসলমানদের আয়ত্তে তখন জেরুজালেমের অধিপতি পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনাস (Patriarch Sophronius) আবেদন করেন যে তাদের আত্মসমর্পণ স্বয়ং খলিফার উপস্থিতিতেই হতে হবে এবং খলিফাকেই তাদের দাবি দাওয়ার কথা শুনতে হবে। তার এই আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
এরই প্রেক্ষিতে ওমর (রা.) জেরুজালেমে পৌঁছেন। তার পরের দিন ফজরের সময় হযরত বিলাল (রা) কে আজান দিতে আহবান করেন। নবী (সা.)এঁর ওফাতের পর থেকে বিলাল (রা.) আর আজান দিচ্ছিলেন না। কিন্তু এই মহান মূহুর্ত্তে খলিফার আবেদনে যখন দাড়িয়ে যান এবং আজান দেন তখন সাহাবীরা (রা.) কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। এই স্বরের সাথে কত স্মৃতি, কত ইতিহাস, কত আবেগ।
সকাল বেলায় আবু ওবায়দা (রা.) কে তাঁর আগমন সংবাদ সফ্রোনাসকে দিতে বলেন। তাই করা হল। কিন্তু এক পর্যায়ে সফ্রোনাসের সাথে যখন কেবল আবু ওবায়দাকে (রা.) নিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছেন তখন তাঁর সাথিরা বললেন, আমিরুল মু’মিনীন আপনি বিনা নিরাপত্তায় যাচ্ছেন, আমাদের ভয় হয় যে যদি তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে, অথচ আপনার সাথে নিরাপত্তার কিছু নেই। ওমর (রা.) পাঠ করলেন, قُل لَّن يُصِيبَنَآ إِلاَّ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَنَا هُوَ مَوْلاَنَا وَعَلَى ٱللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ ٱلْمُؤْمِنُونَ -বলুন, আমাদেরকে কোন মুসীবত আক্রান্ত করতে পারবে না কেবল তা ব্যতীত যা আল্লাহ আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন; তিনি আমাদের প্রভু, আমাদের নির্বাহক। সুতরাং বিশ্বাসীরা কেবল আল্লাহর উপরই নির্ভর করা উচিত (৯:৫১)।
অতঃপর ওমর (রা.) পেট্রিয়ার্ক সফ্রোনাসের সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাদের জানমাল ও ধর্মীয় নিরাপত্তার বিষয়াদি নিশ্চিত করেন। সেই হতে জেরুজালেমে সকল ধর্মের (ইয়াহুদী/খৃষ্টীয়ান) লোকজনের যাওয়া আসা, ইবাদত-আরাধনার নিরাপত্তা বিধিত হয় এবং এটা এভাবেই যুগপৎ হয়ে পড়ে।
প্রথম ক্রুসেড
এগারো শতাব্দীতে ইউরোপিয়ান শাসকেরা ধর্মীয় এবং বাণিজ্যিক অভিপ্রায়ে জেরুজালেমকে মুসলমানদের হাত থেকে কেড়ে নিতে পরিকল্পনা শুরু করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করেন -তা ছোট বড় আকারে ১৩ শো শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে। তাদের যুদ্ধ ও দখলদারিতে প্রাণহাণী ঘটান, নানান রকমের অত্যাচার ও নির্যাতন করেন এবং সর্বোপরি যুদ্ধের অর্থ সংগ্রহ করতে এবং সৈন্য সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিপক্ষে যে চরম মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা করেন তার জের এখনও শেষ হয় নি। ইউরোপ ও মুসলমানদের মধ্যে হাজার বৎসরের টানাপোড়নের সম্পর্ক এই যুদ্ধংদেহী তৎপরতার সৃষ্টি।
১০৬০ এর দশকে সেলজুক (মুসলিম) তুর্কীদের হাতে জেরুজালেমের কর্তৃত্ব চলে গেলে পশ্চিমা দেশে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, কেননা যেকোনো পটপরিবর্তনে অনিশ্চয়তা ও সন্দেহের অবকাশ দেখা দেয়। কিন্তু এই পরিবর্তন সাধারণ ছিল না, এটা ইউরোপিয়ানদের সামনে যুদ্ধের একটি অজুহাত খাড়া করে দেয়। ১০৯৫ সালে বুউয়েঁর গডফ্রি (Godfrey of Bouillon, একজন ফরাসী) সসৈন্যে জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। ১০৯৯ সালে মুসলমানদেরকে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম তাদের দখলে আনেন। এই যুদ্ধে গোটা ক্যাথোলিক চার্চ ও পোপ ২য় আর্বানের (১০৩৫-১০৯৯) সমর্থন ও আশীর্বাদ ছিল।
বিজয়ের পর ক্রুসেড খৃষ্টীয়ানরা যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বহান। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। [১] শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খোর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।
বিজয় ধরে রাখা, পরবর্তী যুদ্ধাদি চালিয়ে যাওয়া এবং সর্বোপরি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে গডফ্রি জেরুজালেমের বাদশার পদে সমাসীন হন।
দ্বিতীয় ক্রুসেড
ক্রুসেডের যুদ্ধ কয়েক দফা হয়েছিল। জেরুজালেম ক্রুসেডদের দখলে থাকা অবস্থায় তারা সেখান থেকে অপরাপর স্থান দখল করার জন্যও যুদ্ধ করে। তাছাড়া ইউরোপ থেকে এই উদ্দেশ্যে আরও যুদ্ধাদি নিয়ে যাওয়া হয়। এগুলোর সবই ক্রুসেডের যুদ্ধ, ধর্মের যুদ্ধ।
একজন ফরাসী এবোট বার্নার্ড অব ক্লেয়ারভক্স (Bernard of Clairvaux) এর আহবানে বাদশাহ ৭ম লুইস ও ৩য় কনরাডের অধীনের একটি ক্রুসেড ১১৪৭ থেকে ১১৪৯ পর্যন্ত চালানো হয়। কিন্তু তারা এই অভিযানে তেমন কোন ফায়দা হাসিল করতে পারেননি। [উইকি, ৩] সালাউদ্দীন আইয়ূবীর জেরুজালেম উদ্ধার
সালাউদ্দীনের সাথে ক্রুসেড খৃষ্টীয়ানরা যুদ্ধ হয় ১১৮৭ সালে। এর কয়েক দশক আগে অপর এক ক্রুসেড যুদ্ধে এই মর্মে বিরতি (truce) আসে যে খৃষ্টীয়ানরা মুসলমানদেরকে হজ্জে যাতায়াতে বাধা দেবে না, ব্যবসায় কাফেলাদেরকে এবং ধর্মীয় কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টি করবেনা। এটাই প্রায় চার যুগ ধরে চলছিল। কিন্তু ১১৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে একটি হজ্জযাত্রী কাফেলাকে রেনোল্ড (Raynald) আক্রমণ করেন, মালামাল লুট করেন এবং তাদেরকে মারধর করে জেলে নিক্ষেপ করেন। রেনোল্ডের উদ্দেশ্য ছিল সালাউদ্দীনকে যুদ্ধে নামানো। অবস্থা এই ছিল যে জেরুজালেমের বাদশাহ বল্ডউইন কোষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে তার ভায়রা (brother in-law) গী অব লুসিগনান (Guy of Lusingnan) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেন, (made him a regent)। কিন্তু গীর সে ধরনের তেমন কোন দক্ষতা ছিল না। তাই তার এক প্রাক্তন-মৈত্রী রেনোল্ড তার কাজে সহায়তা করতেন এবং ‘সুযোগও গ্রহণ করতেন’। [উইকি, ৪]। রেনোল্ড একজন রক্ত-লিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন। [প্রাগুক্ত, নোট ১] । তবে রেনোল্ড কর্তৃক ব্যবসায় কাফেলাকে ইতিপূর্বে হয়রানী করার অভিযোগও আছে।
পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানদের ঐক্য ও শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাই রেনোল্ড ইচ্ছে করেই সালাউদ্দীনকে যুদ্ধে নামিয়ে চূর্ণ করার পরিকল্পনা করেন। এই উদ্দেশেই একটি নিরপরাধ, নিরস্ত্র, হজ্জগামী কাফেলাকে আক্রমণ। এরই জওয়াব দিতে আসেন সালাউদ্দীন আইয়ূবী। ১১৮৭ সালে তিনি ক্রুসেডদেরকে দারুণভাবে পরাজিত করেন এবং জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। তাঁর জেরুজালেমে প্রবেশ ও বিজয় ছিল রক্তহীন।
তৃতীয় ক্রুসেড
সালাউদ্দীনের বিজয় ইউরোপে তুমুল ক্ষোভ ও বিকম্পন সৃষ্টি করে। পোপ ৩য় আর্বান হার্ট এটাক করে মারা যান। স্মরণ রাখা দরকার যে ১০৯৯ সালে যখন জেরুজালেম ক্রুসেডরা দখল করে তখন পোপ ২য় আর্বানের মৃত্যু হয়। পোপ ৭ম গ্রিগোরি পালটা ক্রুসেড নিয়ে যাওয়ার জন্য আহবান করেন। জার্মানের ১ম ফ্রেড্রিক বারোসা, ফ্রান্সের ২য় ফিলিপস অগাস্টাস এক বিরাট বাহিনী নিয়ে জেরুজালেমের দিকে যাত্রা করেন। পথে কোনো এক নদীতে ফ্রেড্রিক ডুবে মরেন। কুলক্ষণ ভেবে বা নিরাশ হয়ে তারা যাত্রা ভঙ্গ করেন।
১১৮৯ সালে ইংল্যান্ডের বাদশাহ তৃতীয় রিচার্ড সেকালের সবচেয়ে ভারী অস্ত্র ও কামান সহ ১৭,০০০ সৈন্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। (প্রাগুক্ত, নোট ১) গন্তব্যস্থলে পৌঁছিলে তার সাথে সিভিলিয়ান হয়ে থাকা ও পলাতক ক্রুসেডরা শরিক হন। তাছাড়া সেই অঞ্চলের খৃষ্টিয়ান সৈন্যরা যারা আগে বল্ডউন ও গীর অধীনে ছিল –তারাও সংঘবদ্ধ হন। অপরদিকে সালাউদ্দীনের সৈন্য সংখ্যা দিন দিন কমে আসছিল, কেননা তার লোকজন ছিল জেহাদ করতে আসা নানান অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষ –যারা পরিবার পরিজন ও ক্ষেত-খামার রেখে বৎসরের পর বৎসর লেগে থাকার মত অবস্থানে ছিল না।
রিচার্ড বিপুল শক্তিতে যুদ্ধ শুরু করেন। তিনি একর, জাফা, কেসারিয়া এবং টায়ার –এই শহরগুলো মুসলমানদেরকে পরাজিত করে নিজ দখলে নেন। দু এক শহরে তুমুল যুদ্ধে কখন এই পক্ষ কখন সেই পক্ষ বিজয় লাভ করতে থাকে।
কিন্তু রিচার্ড প্রথমে একর দখল করেই সেখানে যুদ্ধাপরাধ করেন। তার হাতে ২,৭০০ মুসলিম সৈন্য ধরা পড়লে তিনি কয়েক হাজার স্বর্ণমুদ্রার বিনিয়ে মুক্তিপণে ফিরৎ দিতে রাজি হন। কিন্তু স্বর্ণ হস্তান্তর ও সৈন্য ফিরৎ পাওয়া প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে খানিক দেরি হলে তিনি সকল সৈন্যদেরে সারিবদ্ধ করে শিরচ্ছেন করেন। [প্রাগুক্ত, নোট ১] অনেক তুমুল যুদ্ধের পর ১১৯২ সালে উল্লেখিত শহরগুলো তার কর্তৃত্বে রেখে এবং জেরুজালেম আক্রমণ না করেই রিচার্ড ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। রিচার্ড তখন আহত ছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে তিনি জেরুজালেম বিজয় করতে পারবেন বলে মনে করেননি অথবা বিজয় করলেও তা ধরে রাখতে পারবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন না। পরবর্তী বৎসর সালাদ্দিনের মৃত্যু হয়। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ক্রুসেডদের অনুশোচনা ছিল যে রিচার্ড যদি কোনো রকমে আরও একটি বৎসর থেকে যেতে পারতেন তবে সালাউদ্দীনের মৃত্যুতে তার উত্তরাধিকার নিয়ে যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয় তার সুযোগে জেরুজালেম আক্রমণ করা যেত এবং হয়ত বিজয় আসত। ইংল্যান্ড ফেরার কয়েক বৎসর পর অর্থাৎ ১১৯৯ সালে রিচার্ড মারা যান) ।
অন্যান্য ক্রুসেড
রিচার্ডের ইচ্ছে ছিল তিনি আরেক দফা অভিযান চালাবেন। কিন্তু জেরুজালেমে আহত হবার পর সে ক্ষতস্থান আর পুরোপুরি ভাল নি বরং সেই ক্ষত থেকেই তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে ক্রুসেড যুদ্ধ থেমে যায়নি। এই যুদ্ধ তার পরের একশো বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। কিন্তু ক্রুসেডরা জেরুজালেম দখল করতে সমর্থ হননি। ছোট বড় যুদ্ধ হয়, তাদের মধ্যে হচ্ছে ১২০২-৪ সালে, ১২১২-২১ সালে, ১২২৮-২৯ সালে, ১২৪৯-৫৪ সালে, ১২৭০-৭২ সালে, ও ১২৯১ সালে। [৫] শেষ কথা
ক্রুসেডের যুদ্ধগুলি মুসলিম ভূখণ্ডে অনেক বিপর্যয় এনেছে, অনেক প্রাণনাশ করেছে, তাদের জাতীয় জীবনে ও মানসিকতায় অনেক প্রভাব ফেলেছে। এই কথাটি আবার ইউরোপের ব্যাপারেও সত্য। দুই শো বৎসর ব্যাপী চালিত এই যুদ্ধ ইউরোপের রাজনীতি, সমাজ ও মনন জুড়ে রেখেছিল। যুদ্ধের জন্য বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ জনগণ স্বহস্তে ধন-সম্পদ দান করেছিল, যুদ্ধে গিয়ে জীবন দিয়েছিল, জীবন নিয়েছিল –এই যুদ্ধ তাই মামুলী ছিল না, হতেই পারত না।
বিজয়ের পর ক্রুসেড যোদ্ধারা জেরুজালেমে রক্তের বন্যা বহান। এটা ইউরোপিয়ানদের নিজ বিবরণ অনুযায়ী। [১] শহরে কী নারী, কী পুরুষ, কী শিশু, কী বৃদ্ধ –যাকেই পাওয়া গেছে, তাকেই নিধন করা হয়েছে। বহমান রক্তে নাকী সেদিন ঘোড়ার খোর পিছলে যাচ্ছিল। এই ছিল নিধনের নৃশংসতা।

Comments

comments