ব্রেকিং নিউজ

সর্বোচ্চ মুনাফায় খুলনা শিপইয়ার্ড

1416416596.বিডি এক্সপ্রেসঃ বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পরে এক সময়ের রুগ্ন ও বিরাষ্ট্রীয়করণ তালিকাভুক্ত খুলনা শিপইয়ার্ড গত অর্থ বছরে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ মুনফা লাভের গৌরব অর্জন করেছে। উপমহাদেশের অন্যতম আধুনিক এ নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থ বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার করপূর্ব মুনাফা লাভে সক্ষম হয়েছে। এর আগের অর্থ বছরে যা ছিল ৪৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। চলতি অর্থ বছরে খুলনা শিপইয়ার্ড প্রায় ৬০ কোটি টাকা করপূর্ব মুনাফা অর্জনে সক্ষম হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশা করছেন। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক টার্নওভার গত ১৫ বছরে ১০.৬৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৬ কোটি থেকে ১৭১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে শিপইয়ার্ডটিতে প্রায় ২শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি কন্টেইনার জাহাজ, নৌ-বাহিনীর জন্য ২টি ল্যান্ডিং ক্রাফটসহ দমকল ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা অধিদফতরের জন্য ৩টি ফায়ার ফাইটার বোট ও ৩টি পন্টুন নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে বড় মাপের আরো ২টি অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজের নির্মাণ কাজও খুব শিগগির শুরু হতে যাচ্ছে খুলনা শিপাইয়ার্ডে। গত অর্থ বছরে প্রতিষ্ঠানটি নৌ-বাহিনীর জন্য ৫টি মাঝারি মাপের যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ সম্পন্ন করে।
২০১৩-১৪ অর্থ বছরে খুলনা শিপইয়ার্ড-এ নির্মিত এবং মেরামতকৃত বিভিন্ন নৌযান ও অন্যান্য পণ্যসমূহ থেকে আয় ছিল ১৫৫ কোটি টাকার মতো। যা এর আগের অর্থ বছরে ছিল ১৫১ কোটি। এ নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটিতে গত অর্থ বছরে করপূর্ব মুনাফার পরিমাণ ছিল ৪৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট বাদে আয়করই প্রদান করে ১৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি গত ৪টি অর্থ বছরে খুলনা অঞ্চলের সর্বোচ্চ করদাতার সম্মানও অর্জন করেছে। গত অর্থ বছরে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে ২২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা জমা দেয়ার পরে খুলনা শিপইয়ার্ডের নীট মুনাফার পরিমাণ ছিল ২৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
পরিপূর্ণ মুনাফার ধারা অব্যাহত থাকায় গত কয়েক বছর ধরে খুলনা শিপইয়ার্ড  শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলেও নিয়মিত অর্থ প্রদান করে আসছে। একসময়ের রুগ্ন ও বিক্রি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি এখন শ্রমিক-কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাসও প্রদান করছে। আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ‘আইএসও’র সনদ লাভকারী খুলনা শিপইয়ার্ড ইতোমধ্যেই ‘লয়েডস, সিসিএস, জিএল ও এনকেকে’-এর মত বিশ্বে সেরা নৌ-নির্মাণ, পর্যবেক্ষণ ও সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের পর্যবেক্ষণে কাজ করারও গৌরব অর্জন করেছে।
ইতোমধ্যেই এ শিপইয়ার্ডে যে কোনো ধরনের নৌযানের ‘ব্লক কনস্ট্রাকশন’সহ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতেও নির্বিঘেœ স্বাভাবিক কর্মকা- অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে দেশের বৃহত্তম ফেব্রিকেশন শেড নির্মাণ করা হয়েছে। ১০১ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৭০ মিটার প্রস্থ এ ফেব্রিকেশন ইয়ার্ডটির উচ্চতা ২৯ মিটার। যার মধ্যে ১শ’ মিটার দৈর্ঘ্যরে ১০টি ট্র্যাক একইসাথে ন্যূনতম ৪টি ভারী নৌযানের ব্লক কাজ সম্পন্ন করা যাবে। এর ফলে ইয়ার্ডটিতে সারা বছর ধরেই যে কোনো ধরনের নৌযানসহ ভারী কারিগরি সরঞ্জামাদি নির্মাণ ও মেরামত কাজ নির্বিঘেœ পরিপূর্ণ মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। খুলনা শিপইয়ার্ডে সোয়া ৩শ’ ফুট দৈর্ঘ্যরে ৭শ’ টন ক্ষমতার যে কোনো ধরনের নৌযান ডক ও আনডক করার ক্ষমতা সমৃদ্ধ স্লীপওয়ে রয়েছে। এসব স্লীপওয়ের ৮টি বার্থের প্রতিটিতেই প্রায় সোয়া ৩শ’ ফুট দৈর্ঘ্যরে যে কোনো নৌযান নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের সুযোগ রয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে ৮ টন ক্ষমতার ১টি ও ৫ টন ক্ষমতার ২টি বার্থ ক্রেন, ৩০ টন ক্ষমতার ১টি মোবাইল ক্রেন ছাড়াও একই ক্ষমতার অপর একটি ড্রিক ক্রেনও রয়েছে। শিপইয়ার্ডটির অভ্যন্তরে ৫-১০ টন ক্ষমতার একাধিক ওয়ার্কসপ ক্রেন ছাড়াও ফর্ক লিফ্টারের মতো বিশেষায়িত বিভিন্ন ধরনের কারখানা-সরঞ্জামও রয়েছে।
১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন সংস্থা-ইপিআইডিসি জার্মানির কারিগরি সহায়তায় খুলনা শিপইয়ার্ড-এর নির্মাণ কাজ শুরু করে। ১৯৫৭ সালের ২৩ নভেম্বর খুলনা মহানগরীর অদূরে লবণচরা এলাকায় রূপসা নদীর ধারে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে নানা ধরনের আধুনিক নৌ-নির্মাণ প্রযুক্তি স্থাপন ও সংযোজনের মাধ্যমে শিপইয়ার্ডটিকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়া হয়। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত শিপইয়ার্ডটি জার্মান ব্যবস্থাপনায় ও ১৯৬৫ পর্যন্ত জার্মান-বৃটিশ যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে এর সমুদয় দায়িত্ব ও পরিচালন ব্যবস্থা ইপিআইডিসি গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পরে উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থা-বিএসইসি এর দায়িত্ব গ্রহণ করে।
কিন্তু ১৯৫৭ সাল থেকে ’৬২ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৪৬ লাখ টাকা লোকসান দেয়। আর ১৯৬২ থেকে ’৬৯ পর্যন্ত লাভ হয় মাত্র ৬৬ লাখ টাকা। ১৯৬৯ থেকে ’৭৩ সাল পর্যন্ত পুনরায় প্রতিষ্ঠানটি আবার ৪২ লাখ টাকা লোকসান গোনার পরে ১৯৭৩-৮৪ সাল পর্যন্ত ৫.৯১ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন  করে। এরপর থেকেই খুলনা শিপইয়ার্ড লাগাতার লোকসান গুনতে গুনতে এক সময়ে রুগ্ন শিল্পে পরিণত হয়। এমনকি একসময়ে প্রতিষ্ঠানটি বিরাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কয়েক দফা চেষ্টা করেও বিক্রি করা সম্ভব না হওয়ায় তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে খুলনা শিপইয়ার্ডকে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।  
১৯৯৯-এর ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর কাছে হস্তান্তর পূর্ব পর্যন্ত খুলনা শিপইয়ার্ড প্রায় ৯৩.৪০ কোটি টাকা দেনাসহ মোট দায়দেনা ছিল প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। নৌ-বাহিনী দায়িত্ব গ্রহণের পরে সব বিপত্তি কাটিয়ে গত অর্থ বছর পর্যন্ত খুলনা শিপইয়ার্ড প্রায় ২শ’ কোটি টাকা নীট মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে সরকারি কোষাগারে ভ্যাটসহ প্রায় ৬০ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের কর প্রদান করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১০-১১ অর্থ বছরে ৯.১৭ কোটি, ১১-১২ অর্থ বছরে ৯.২৬ কোটি, ১২-১৩ অর্থ বছরে ১৪.৯০ কোটি এবং সদ্য সমাপ্ত ১৩-১৪ অর্থ বছরে ১৫.৮৬ কোটি টাকা আয়কর প্রদান করেছে।
খুলনা শিপইয়ার্ড এ পর্যন্ত ৭০৫টি নতুন নৌযান নির্মাণ ছাড়াও ২ হাজার ১৫৯টি বিভিন্ন ধরনের নৌযানের মেরামত ও পুনর্বাসন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এরমধ্যে ১৯৯৯ সালের শেষভাগে নৌ-বাহিনী দায়িত্ব গ্রহণের পরে প্রতিষ্ঠানটি ১১২টি নতুন নৌযান নির্মাণ এবং ৫০৭টি নৌযানের মেরামত ও পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে গত ৩০ জুন দেশের নৌ-নির্মাণ শিল্পে সর্ববৃহৎ একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড ও বাংলাদেশে নৌ-বাহিনীর মধ্যে। প্রায় ৮শ’ কোটি টাকার এ চুক্তির ফলে দুটি বড় মাপের যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণের অর্ডার পেয়েছে খুলনা শিপইয়ার্ড। আগামী জানুয়ারিতেই প্রধানমন্ত্রী অত্যাধুনিক এ দুটি যুদ্ধ জাহাজের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ও কাজের গুণগতমানের বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, চীন ও তুরস্কের বিভিন্ন নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানসমূহ যৌথ উদ্যোগে কাজ করারও আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছেন খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর ইরশাদ আহমদ। তবে হজরত খান জাহান আলী (রহ.) সেতু নির্মাণসহ রূপসা নদীর ক্রম হ্রাসমান নাব্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যতে আরো বড় কার্যক্রম সম্পাদনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে মংলা বন্দরের ভাটিতে জয়মনিগোল এলাকায় একটি ‘ফরোয়ার্ড ইয়ার্ড’ নির্মাণেরও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার জমিও বরাদ্দ করেছে বলে জানান তিনি। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৭শ’ টন লাইট ওয়েট ও আড়াই হাজার টন বহন ক্ষমতার পণ্য ও জ্বালানিবাহী নৌযান নির্মাণ ও মেরামত হচ্ছে।
নৌ-বাহিনীর প্রধান পদাধিকার বলে খুলনা শিপইয়ার্ডের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ৪ জন জিএম ছাড়াও একদল চৌকশ ও মেধাবী নৌ-কর্মকর্তাসহ প্রায় ১ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী এ নৌ-নির্মাণ প্রতিষ্ঠানটিকে তাদের সন্তানের মতোই লালন করছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টগণ। খুলনা শিপইয়ার্ড শুধু দেশের অর্থনীতিতেই অবদান রাখছে না, তা গোটা উপমহাদেশের নৌ-নির্মাণ শিল্পেই বাংলাদেশের অবস্থানকে সংহত ও গর্বের স্থানে নিয়ে গেছে ইতোমধ্যে।

 

Comments

comments