ব্রেকিং নিউজ

নিঝুম দ্বীপে হারিয়ে যাচ্ছে হরিণ

08_36071নোয়াখালী সংবাদদাতাঃ প্রকৃতিক সৌন্দযের্র অপরূপ লীলাভূমি নিঝুম দ্বীপ। মেঘনাবেষ্টিত নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এর অবস্থান। নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ ও অমূল্য সম্পদ হরিণ। তবে নানা কারণে সেখানকার হরিণ বিলীন হওয়ার পথে। প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে হরিণের সংখ্যা।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে নিঝুম দ্বীপে হরিণের সংখ্যা ৩০ সহস্রাধিক। কেবল গত এক বছরে ৩ থেকে ৪ হাজার হরিণ শিকার ও পাচার করা হয়েছে এখান থেকে।
নিঝুম দ্বীপের কয়েকটি চরে বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দল বেঁধে হরিণের পালকে খাদ্যের অন্বেষণে বিচরণ করতে দেখা যায়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শিকারিরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। হরিণ ধরে জবাই করে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলাসহ ভিআইপিদের জন্য লোভনীয় মাংস উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়। এ ছাড়া আটকে থাকা ফাইল ছাড়ার জন্য তদবির হিসেবে হরিণের মাংস একটি বড় অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কয়েক মাস আগেও পাচারের সময় তমরুদ্দি লঞ্চঘাট এলাকায় মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে যাত্রীবাহী সি-ট্রাক থেকে ১৪২ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া নিঝুম দ্বীপের দক্ষিণে সমুদ্রে মৎস আহরণ করতে আসা জেলেরা ট্রলারে করে হরিণ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাচার করে। আবার খাদ্যের অন্বেষণে লোকালয়ে যাওয়া শত শত হরিণ ধরা পড়ছে শিকারিদের হাতে।
এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সময় জোয়ারে দ্বীপ থেকে শত শত হরিণ সাঁতরে ভোলার মনপুরাসহ বিভিন্ন দ্বীপে আশ্রয় নিচ্ছে। মনপুরা, ঢালচরসহ কয়েকটি চরে এখন শত শত হরিণ বিচরণ করছে বলে জানা গেছে।
দ্বীপের কয়েকজন অধিবাসী জানান, শিকারিদের হাতে প্রতিবছর দুই সহস্রাধিক হরিণ ধরা পড়ছে। হাতিয়া উপজেলার কয়েকটি হাট বাজারে মাঝেমধ্যে হরিণের মাংস পাওয়া যায়। তবে অতি গোপনে এ বেচাকেনা সম্পন্ন হয়। প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিঝুম দ্বীপের আশপাশ এলাকায় বেশ কয়েকটি চক্র হরিণ শিকারে নিয়োজিত রয়েছে। হরিণের অবাধ বিচরণে বাধা বেওয়ারিশ কুকুর। হরিণ দল বেঁধে বিচরণে আসে। লোকালয়ে তখন কুকুরগুলো বাঘের ভূমিকায় নেমে জ্যান্ত হরিণ মেরে খেয়ে ফেলে। নিঝুম দ্বীপের চৌধুরী খালের চরসহ বেশ কয়েকটি জঙ্গলে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হরিণের কঙ্কাল ও আধপচা মৃতদেহ দেখেন স্থানীয়রা। তারা জানান, লোকালয় থেকে বনে পালিয়ে আসা কুকুরের হাতেই প্রতিদিন এসব হরিণ মরা যাচ্ছে।
অন্যদিকে হরিণের প্রধান খাবার কেওড়াগাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে আসায় গরমের দিনে খাবার না পেয়েও মারা যাচ্ছে অনেক হরিণ। স্থানীয় লোকজন জানান, মানুষ আর কুকুর মিলে এভাবে হরিণ নিধন করতে থাকলে অচিরেই নিঝুম দ্বীপ হরিণশূন্য হয়ে যাবে।
দ্বীপ থেকে কিছু হরিণ দেশের বিভিন্ন উদ্যানে স্থানান্তরের লক্ষ্যে কয়েক বছর পূর্বে নোয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে একটি চিঠি পাঠান। কিন্তু এরপর তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। নিঝুম দ্বীপের হরিণ রক্ষায় এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
নিঝুম দ্বীপের হরিণ নিয়ে স্থানীয় বন বিভাগও বিপাকে পড়েছে। একদিকে হাজার হাজার হরিণের খাদ্যসংকট, অন্যদিকে হরিণ শিকারিদের দৌরাত্ম্য বন্ধে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের ১১টি চরের সমন্বয়ে ৪০ হাজার ৩৯০ একর ভূমিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিগত ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সালে আট জোড়া হরিণ অবমুক্ত করা হয় নিঝুম দ্বীপে। এর পর থেকে হরিণের বংশবিস্তার ঘটতে থাকে। ২০০১ সালে সরকার এই দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে।
এ বিষয়ে নোয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সানা উল্যা পাটোয়ারী জানান, পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে হরিণ শিকারিদের দৌরাত্ম্য রোধ করা যাচ্ছে না। তা ছাড়া, খাদ্য সংকটেও হরিণ দিন দিন কমে যাচ্ছে।

Comments

comments