ব্রেকিং নিউজ

ধর্ম বনাম করোনা ভাইরাস

আঞ্জুমান রোজী

বাংলাদেশে মানুষের ধর্মানুভূতি খুব স্পর্শকাতর। ধর্মীয় বিশ্বাসটাও তাদের আয়রনিক। একদম কোনো অবস্থাতে নড়চড় হবেনা। অথচ মানুষের স্বভাবসুলভ ব্যাপার হলো প্রকৃতিজাত। যা সময়ের স্রোতে প্রকৃতির মতো  পরিবর্তন বা বদলে যাওয়ার নেশায় বয়ে চলে। একঘেয়েমি জীবন কটা মানুষই বা পছন্দ করে! বৈচিত্রপূর্ণ জীবনই তো সার্থক জীবন। সময়ের স্তরে স্তরে বিশ্বাসের ব্যারোমিটারও উঠানামা করে। এরমধ্য দিয়েই  জীবন, জগত, প্রকৃতি দেখে মানুষ অভিজ্ঞলব্ধ হয়।

কিন্তু ধর্ম এমন একটি কংক্রিট বিষয় যা থেকে এতটুকু বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আর বিচ্যুত হতে পারেনা বলেই ধার্মিক মানুষগুলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে টালমাটাল হয়ে যায়। যদিও আজকাল অনেক ধার্মিক আছে যারা সভ্য যুগে বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হয়ে সবরকম সুযোগ সুবিধা নিয়ে জীবন চালাচ্ছে। তারপরও ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গাতে থাকছে অনড়, বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া তো দূরে থাক। ফলে, যারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে কিম্বা যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনকে স্বাগতম জানায় অর্থাৎ যারা মূলত প্রগতিবাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক ; তাদের কাছে ধার্মিক মানুষ সম্পর্কে এক বিশাল প্রশ্ন দেখা দেয়। কারণ, ধর্মের সঙ্গে  তাদের বাস্তব জীবনযাপনের কোনো মিল পাওয়া যায়না।

আমার পাঁচবছর বয়স থেকে ধর্মের হাতেখড়ি। স্কুলেও তখন থেকে যাওয়া শুরু। স্কুলের লেখাপড়ার পাশাপাশি ধর্মশিক্ষাটাও বাধ্যতামূলক ছিল। নিয়ম করে রুটিন মেনে এসব করতে হতো। ধর্মীয় বিশ্বাস্টাও একটু একটু মাথায় ঢুকতে শুরু করলো।   আল্লাহর ভয়ে মিথ্যা না-বলা,  সব অবস্থায় সত্য বলা, মানুষের মনে কষ্ট না দেয়া, মানুষের  উপকার করা, গরীব-দুঃখীর পাশে থাকা, মানুষের বিপদ-আপদে হাত বাড়িয়ে দেয়া, বাবা মা মুরুব্বি বা বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা; এসব বেশ রপ্ত করতে চেষ্টা করলাম। যেভাবে আমার বাবা মা বুঝাতেন ঠিক সেভাবে।

 সারাদিন  পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আউট বইও পড়তে হতো।  এর বাইরে খেলাধুলা, মুকুল ফৌজে যাওয়া আর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও জড়িত ছিলাম। ধর্মকর্ম করা আর স্কুলের পড়াশোনাটা ছিল আমাদের জন্য ফরজ অর্থাৎ করতেই হবে। তারপরেও আব্বা বলতেন, "আমার দায়িত্ব আমি পালন করে যাচ্ছি। সাধ্যের মধ্যে আমার যা শিক্ষা আছে তাই দিয়ে যাবো  সন্তানদের।  শিক্ষায় দীক্ষায় বড়  হয়ে ছেলেমেয়েরা  কি বিশ্বাস করবে আর না করবে সেটা তাদের একান্তই  ব্যক্তিগত ব্যাপার।" ধর্ম পালনের ব্যাপারে আমাদের পরিবারে কখনই মানসিক চাপ দেওয়া  হতো না। যা এখন খুবই বাধ্যতামূলক।

আমার বাবা মা'র মতে, ধর্মকর্ম হলো নিজেকে শুদ্ধ রাখার কর্ম। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার মধ্য দিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকার পাশাপাশি মনের ভেতর যেনো কোনোরকম কলুষতা ভর না করে অর্থাৎ খারাপ কাজ বা বদ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য মানসিকতা যাতে না জাগে তারজন্য শুধরিয়ে চলার চেষ্টায় ব্রত হওয়া। এভাবেই কৈশোর জীবন পার হয়ে তারুণ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছি। আমার ভেতর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন  বিষয় নিয়ে প্রশ্ন জাগতে শুরু করলো । প্রশ্ন করে করে আব্বা আম্মাকে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলতাম। বিশেষ করে আল্লাহ কে, আল্লাহ কেমন, এমন প্রশ্ন  অনবরত করাতে আম্মা একদিন বললেন, " আল্লাহকে নিয়ে বেশি ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। তখন তোকে সবাই পাগল বলবে।" ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। আল্লাহ এক অলৌকিক  শক্তি, তাই ভেবে নিলাম।

আব্বা আমাদের কাছে একাধারে  শিক্ষক, দার্শনিক এবং অভিভাবক ছিলেন। ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন।

আব্বা আম্মা দুজনে ধর্মকর্ম পালন করলেও খুবই কেতাদুরস্ত আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৃথিবীর সবরকম খবরের উপর নজর রাখতেন। সময়ের গতিবিধি বোঝার চেষ্টা করতেন। সেইসাথে তারা প্রচণ্ড রকমের সংস্কৃতিমনাও ছিলেন।  আম্মা প্রচুর বই পড়তেন। যা দেখে আমার বইপড়ার অভ্যাস তৈরি  হয়। ধর্ম তারা পালন করতেন প্রতিদিনের নিয়মমাফিক খাদ্যগ্রহনের মতো। আর ধর্মবিশ্বাসটা ছিল নিজেকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য। তবে বিশ্বাসের ব্যাপারে কারোর উপর জোরপূর্বক বাধ্যবাধকতা ছিল না। আব্বা বলতেন, মানবিক গুণাবলী যদি কারোর ভেতর বিদ্যমান থাকে তাহলে ধর্মবিশ্বাসটা হবে যারযার ব্যাপার।

এভাবে চলতে চলতে নিজের মধ্যে যখন নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম তখন আমার পৃথিবী একটু একটু করে বদলে যেতে লাগলো। এই পরিবর্তন অনেকের চোখে অস্বাভাবিক মনে হলেও আব্বা কখনই বিব্রতবোধ করতেন না। যে কোনো বিষয়ে আব্বা আমার সঙ্গে আলোচনা করে বুঝিয়ে দিতে চাইতেন। কিন্তু কখনোই মানসিক চাপ সৃষ্টি করেননি। কঠিন বাস্তবতা এবং মানুষের দ্বিচারণ স্বভাব আমার মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নের উদ্রেক করে। যেভাবে ছোটকাল থেকে শিখে বড় হচ্ছিলাম ঠিক সেভাবে আর কিছুই পেলাম না। চারদিকের মিথ্যাচারে অতিষ্ট  হয়ে নিজেকে আবিষ্কার  এবং পারিপার্শ্বিকতা বোঝার নেশায় বুদ হলাম। তবে এটাও সত্য, আমি কোনো না কোনো অদৃশ্যমান শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আসলে, প্রকৃতিই আমার শক্তি। প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বর, ভগবান, আল্লাহকে খুঁজি। আমি বিশ্বাস করি এরাই আমাকে আগলে রেখেছে।

তাই, নিজেকে কখনো নৈরাশ্যবাদী মনে হয়। আবার কখনো সংশয়বাদী মনে হয়। আমার মধ্যে বিশ্বসৃষ্টির এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে, আবার এক সংশয়ও কাজ করে। তারপরেও  চলনে-বলনে-মননে এক হয়ে সততার জায়গাটা ক্রিস্টাল ক্লিয়ার রেখে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করি। এর বিনিময়ে অনেকসময়  ইতিবাচক ফলও পাই।  আর আমার বাদবাকি জীবনে অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনাহূত যা ঘটে তার সবটুকু ধরে নেই 'আমার হয়তো কোথাও ভুল ছিল'। তখন কৈশোরের সেই বিশ্বাসটা আঁকড়ে ধরি। এই তো আমি! আমার বিশ্বাস আমার মধ্যে এভাবেই লালন করে চলছি।

অথচ, এখন এমন একটা সময়ের মধ্যে আছি, যেখানে শত মানবিক গুণাবলীই থাকুক না কেন ধর্মকর্ম  না করলে খাঁটি মানুষ হওয়া যায়না। যদি এই করোনাকালে করোনা আক্রান্ত হই, আমাকে নির্ঘাৎ বলে বসবে, নামাজ পড়ি নাই তাই করোনা ধরেছে। আশেপাশে সারাক্ষণ শুনতে হচ্ছে করোনা নাকি আল্লাহর গজব। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে আল্লাহকেই বেশি বেশি স্মরণ  করতে হবে। আমি যে স্মরণ  করিনা, এই মুসলিম ভাই ও বোনেরা কিভাবে বুঝে! বিশ্বাস কি দেখানোর বিষয়?  ধ্যানের মধ্যে ডুবে গিয়ে প্রকৃতিতে নিজেকে সোপর্দ করা, সেও তো এক বিশ্বাস! আমার সারাজীবনের  শিক্ষা,  ধ্যান, বিশ্বাস  সব যেন এখন এই করোনাকালে এসে আঘাত করছে। আমি জানিনা এ থেকে মুক্তি কোথায়!

তবে, আশরাফুল মখলুকাতের সব সৃষ্টির প্রতি সমান বিশ্বাস এবং সম্মান রেখে বলছি, আজ মানবতা হুমকির মুখে। বিশ্বময়  কঠিন বিপর্যস্ত অবস্থা বিরাজমান। আস্তিক, নাস্তিক, নৈরাশ্যবাদ, সংশয়বাদ, অস্তীত্ববাদ যে যেভাবে যাইই বিশ্বাস করুক না কেন, সবাই এখন করোনা ভাইরাসে ভীতসন্ত্রস্ত। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ, সব এখন করোনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এককাতারে দাঁড়াচ্ছে। সাদা কাফনের হাতছানি আর মৃত্যু মিছিলের দৃশ্য যে খুব  দৃশ্যমান। কানাডা প্রবাসী কবি ও লেখক।

Comments

comments