ব্রেকিং নিউজ

কোটা আন্দোলনে নতুন মোড়, বিপাশার চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন কমিটি

প্রতিবেদক :
কোটা সংস্কার দাবিতে গঠিত ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর আগের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিপাশা চৌধুরীকে। এ ছাড়া সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে তা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সময় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া কমিটির সদস্যদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে আন্দোলনকারীরা। পরে সোমবার রাতে অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে আবার অবস্থান শুরু করবেন আন্দোলনকারীরা।
এদিকে আজ বেলা ১১টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছেন নতুন সমন্বয়ক বিপাশা চৌধুরী। তিনি বলেন, কাল (আজ) থেকে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে।
এর আগে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বৈঠকের পর এক মাসের জন্য কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদের দেওয়া এ ঘোষণা ‘মানি না, মানব না’ বলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে আন্দোলনকারীদের একাংশ। তারা সোমবার রাতে শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ও বাংলা একাডেমি এলাকায় অবস্থান নিয়ে  সেøাগান দিতে থাকেন। এ তিন স্থানে হাজারো আন্দোলনকারী ছিলেন। কিন্তু রাত বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের এ অংশের শিক্ষার্থীরা চলে যেতে থাকেন।
গতকাল সোমবার বিকালে ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ ১৯ প্রতিনিধির সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠক করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল। বৈঠক শেষে ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করার ঘোষণা দেন পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন কোটা সংস্কারের দাবিতে অবস্থানকারীদের একাংশ। তারা রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ করতে থাকেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নেয় আশপাশে।
গত রাত পৌনে ৯টায় সচিবালয়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রতিনিধি মো. উজ্জল মিয়া বলেন, সচিবালয়ের বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে আমরা আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা জানাই। কিন্তু অনেকেই এ সিদ্ধান্ত না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমাদের মনে হচ্ছে, আন্দোলনকারীদের মধ্যে কিছু অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়েছে। তারা আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চাচ্ছে। ওই অনুপ্রবেশকারীরাই আমাদের সিদ্ধান্ত না মেনে উল্টো আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে।
সাংবাদিকদের সামনে বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দর আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের বলেছি, আগামী ৭ মের মধ্যে সরকার বিদ্যমান কোটার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। সে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত থাকবে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, তরুণরা এই কোটা সংস্কার আন্দোলন করছেন। তারা আমাদের রাজনীতির অপরিহার্য অংশ, তারাই নতুন প্রজন্ম। আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যই রাজনীতি করি। তাই শেখ হাসিনার সরকার কখনো তরুণদের যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করেনি। সেই ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রধানমন্ত্রী আমাকে পাঠিয়েছেন। আমার সঙ্গে আমার সহকর্মীরা আছেন। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা আছেন। তাদের বক্তব্য আমরা শুনেছি।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিষয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে সেতুমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি নিয়ে একটা সমাধান খুঁজে পাওয়ার জন্য এরই মধ্যে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ বৈঠকের নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েক মিনিট আগেও প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কোটা পদ্ধতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সোয়া দুই ঘণ্টা আলোচনার পর আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের পাশে নিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকার অনড় অবস্থানে নেই। আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি। তাদের দাবির যৌক্তিকতা আমরা ইতিবাচকভাবেই দেখব। মন্ত্রী বলেন, মে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে সরকার রিভিউ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। রেজাল্ট কী আসে আমরা সেটা জানিয়ে দেব। তারা কথা দিয়েছেন, ওই পর্যন্ত তারা তাদের চলমান আন্দোলন স্থগিত রাখবেন।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া, সদস্য এসএম কামাল হোসেন ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের পক্ষে কোটা সংস্কার আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, কানিজ ফাতেমা আফসানা সাফা, একরামুল হক, আল ইমরান হোসাইন, লীনা মিত্র, আরজিনা হাসান, লুবনা জাহানসহ ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বৈঠকে অংশ নেয়।
ওবায়দুল কাদেরের আগে গণমাধ্যমে কথা বলেন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। কোটা সংস্কারের বিষয়টি আমলে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান তিনি। বলেন, আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আমাদের এ আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করা হলো। এখন পর্যন্ত আমার যেসব ভাইবোন গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের সবাইকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া হবে এবং পাশাপাশি যারা আহত হয়েছেন তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবে সরকার।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রবিবার রাতে সংঘাত চলাকালে উপাচার্যের বাসভবনে তা-বের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শাস্তি পেতে হবে বলে বৈঠক শেষে সাফ জানিয়ে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাদের। বলেন, আমি ‘ব্রাইট অ্যান্ড ব্রিলিয়ান্ট’ তরুণদের কাছে জানতে চেয়েছি, কোটা সংস্কারের সঙ্গে ভিসি কীভাবে জড়িত? তিনি আর তার পরিবার কেন আক্রান্ত হবে? তারা একমত। তারা বলেছে, এর মধ্যে অনুপ্রবেশকারী বহিরাগত সন্ত্রাসী থাকতে পারে। আমি পুলিশ কমিশনারকে বলেছি, নিরীহ কাউকে যেন ধরা না হয়।
বর্তমানে দেশে পাঁচ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য। প্রতিবন্ধী এক শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ও জেলা কোটা ১০ শতাংশ করে। সব মিলিয়ে কোটার জন্য বরাদ্দ ৫৬ শতাংশ। ফলে এর কোনো শ্রেণিতে যারা পড়েন না, তাদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বাকি ৪৪ শতাংশের জন্য। এ পদ্ধতি সংস্কারের জন্য পাঁচদফা দাবিতে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে আন্দোলন চালিয়ে আসছে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাদের দাবিগুলো হলÑ সরকারি নিয়োগে কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, কোটার যোগ্য প্রার্থী না পেলে শূন্যপদে মেধায় নিয়োগ, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অভিন্ন বয়সসীমা, নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার না করা।
আন্দোলনরতরা রবিবার শাহবাগ মোড় চার ঘণ্টা অবরোধ করে রাখার পর পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে এবং রাবার বুলেট-কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে সরিয়ে দেয়। এর পর বিক্ষোভ আর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। রাত দেড়টা থেকে ২টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। টিএসসিসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে রাতভর।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গতকাল সোমবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ওই বিক্ষোভ থেকেই দুপুরে তাদের মুখপাত্র হাসান আল মামুন সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সচিবালয় থেকে আন্দোলনকারী প্রতিনিধি দলটি ক্যাম্পাসে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত জানালে তা মানতে অস্বীকৃতি জানায় আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বলছে, এ সিদ্ধান্ত মেনে নিলে আন্দোলন থেমে যাবে। প্রজ্ঞাপন জারি করতে এত সময় লাগার কথা নয়। সরকার চাইলে তা আজই ঘোষণা দিতে পারত। সামনে রোজা, তাই তাদের এ দাবি পূরণ হবে না বলে মনে করছেন। ঘোষণার পর পরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীরা। তারা এ কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি তুলেছেন। সন্ধ্যায় পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ফের ফুঁসে ওঠে। আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন হল থেকে নতুন করে জড়ো হয়। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়কে লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল করেন শত শত শিক্ষার্থী। রাজু ভাস্কর্যে জমায়েত হওয়া শিক্ষার্থীরা কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে সেøাগান দিতে থাকেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও মধুর ক্যান্টিন, হাকিম চত্বরে অবস্থান করছেন। পুলিশও রয়েছে সতর্ক অবস্থানে।
বিদ্যমান কোটার সংস্কার চেয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন করে আসছে। গত রবিবার তাদের পদযাত্রা ও অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে ঢাকায় পুলিশ বাধা দিলে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

 

Comments

comments