প্রতিরক্ষা সামর্থ্য ছাড়া কূটনৈতিক সফলতা কতটুকু?


মুশফিকুর রহমান
বিশ্বের যে কোনো দেশের অর্থনীতি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির ধারণা অনেক পুরনো। প্রতিরক্ষা সামর্থ্যর সঙ্গে একটি দেশের অর্থনীতি ও কূটনীতি অনেক বেশি সচল থাকে। দেশের ভৌগোলিক অখন্ডতা ও অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সেনা সামর্থ্য কতটুকু হওয়া দরকার, তা বর্তমানে ভূরাজনীতির দিকে তাকালে সহজে অনুমান করা যায়। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সব বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমান বিশ্বে যার যত বড় অর্থনীতি, তার তত বড় সামরিক শক্তি। এ দুটি বিষয় একটির সঙ্গে আরেকটি যমজ ভাইয়ের মতো।অন্যভাবে বললে বলা যায়, একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনৈতিক বিকাশ ও সামাজিক শৃঙ্খলা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সামরিক শক্তি যত দুর্বল হবে, বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র ততই ডালপালা গজাবে। দেশের অর্থনীতি ও জনগণের নিরাপত্তা ততই নাজুক হবে। আবার নিরাপত্তা হলো টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে এর একীভূতকরণের পূর্বশর্ত। নিরাপত্তা না থাকলে বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তির সঙ্গে সহিংসতা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। সামরিক সক্ষমতা থাকলে কূটনৈতিক সফলতা সহজেই অর্জন করা যায়।
সামরিক শক্তি থাকায় ভারত স্বাধীন হায়দরাবাদ, সিকিম ও কাশ্মীর দখল করার পরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক সফলতা লাভ করে। যদিও কাশ্মীরে গণভোট প্রশ্নে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবনা নিয়ে পাক-ভারত বিরোধ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি চীনের দোকলাম মালভূমিতে দিল্লির পেশিশক্তি চীনের অনমনীয় সামরিক শক্তির কারণেই ভেস্তে যায়। 
ডোকলাম থেকে ভারত পিচু হটে আসলেও গনচীনকে বুজিয়ে দিয়েছে, যে কোন আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে তৈরী আছে ভারত। বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠিতে বিভক্ত ভারত সামরিক শক্তির বলে আজ অর্থনীতিতে উদীয়মান শক্তি।অভ্যন্তরীন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে সেনা শক্তি ব্যাবহার করেও অর্থনীতির শক্ত ভীত ধরে রাখতে পেরেছে।সব কিছুই সম্ভবপর হয়েছে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নীতির কারনে।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে পারলে পরিস্থিতি অনুকূলে আসতে পারে। তবে কূটনীতির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারলে মিয়ানমারের সঙ্গে দর-কষাকষির জায়গাটা অনেক সহজ হবে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য চেয়ে মিয়ানমারের সামরিক শক্তি অনেক বেশি থাকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের উদ্বেগকে পাত্তা দিতে চাইছে না মিয়ানমার। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত ‘ক্লিনজিং পরিকল্পনা’ গ্রহণ করে। অথচ দীর্ঘদিন উর্দি শাসনে থাকা মিয়ানমার সেনাবাহিনী বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও গোপনে প্রতিরক্ষা সামর্থ্য ও সেনা সরঞ্জামের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যা পাঁচ কোটি। সামরিক শক্তিতে বিশ্বে মিয়ানমারের অবস্থান ৩১তম। দেশটির সেনা সংখ্যা পাঁচ লাখ ১৬ হাজার। আর ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশের সেনা অবস্থান ৫৭তম। সামরিক বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা দুই লাখ পাঁচ হাজার। সূত্র : http://www.ntvbd.com (১৮ সেপ্টম্বর ২০১৭)
বিগত এরশাদ-বিএনপির শাসনামলে যৌক্তিক কারণ থাকার পরও বাংলাদেশে অজ্ঞাত কারণে সেনাবাহিনীর আকার ও সামরিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি করতে পারেনি। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের পর সেনাবাহিনীর বাজেট বৃদ্ধিসহ অস্ত্র সরঞ্জাম বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছেন। আন্তর্জাতিক উদ্বেগ উপেক্ষা করে চীন থেকে দুটি সাবমেরিন ক্রয় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে সত্যি কিন্তু মিয়ানমারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সামর্থ্য আমাদরে এখনও তৈরি হয়নি। 
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করতে হলে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সংকট সমাধানে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বে ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণে মিয়ানমারের পক্ষে চীন-রাশিয়ার সমর্থন অস্বাভাবিক কিছু নয়। ভারত সরকার মিয়ানমার সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে বের করে দেয়ার কথা বলছে। রাখাইনে মিয়ানমার আর্মির গণহত্যা চলাকালীন অবস্থায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির মিয়ানমার সফর সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। অবশ্য বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য ভারত অনেক ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। তবে এটা ভারতের কৌশলগত কূটনীতির অংশ হতে পারে। চীন-রাশিয়ার অবস্থান বাংলাদেশবিরোধী নয়। এটা হলো বৈশ্বিক রাজনীতির একটা ধারা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বকে এই অঞ্চলে নাক গলালোর সুযোগ না দিতেই চীন-রাশিয়ার বিরোধিতা। বর্তমান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র নাক গলানোর সুযোগ পেলেই এ অঞ্চলে অস্থিরতার মাত্রা যে বেড়ে যাবে, তা সবাই অবগত। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ইন্ধন জোগাবে, এটা শতভাগ নিশ্চিত। কারণ ভারত, আমেরিকা, ইসরাইল একই মেরুতে অবস্থান করছে। এই ত্রিদেশীয় সমঝোতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সুযোগ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কারও অজানা নয়। সমস্যার সামাধান তো দূরের কথা, তাদের ভূমিকার কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসের বিস্তার বেড়েছে শতগুণ। এ বিবেচনায় হয়তো চীন-রাশিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা দেখতে চায় না। তবে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের পক্ষে দেশ দুটি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তখন চীন সরকারের কূটনীতির কারণেই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়। যদিও কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে যায়। ’৭৮ ও ’৯২-র ঘটনা থেকে আমরা কতটুকু শিক্ষা নিতে পেরেছি? রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সফলতা কতটুকু? বলতে গেলে কূটনৈতিক সফলতা এতটুকু বলা যায়, কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফিরিয়ে নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের স্থায়ী নাগরিকত্ব অথবা সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের দমন-পীড়ন থেকে মুক্ত করার কোনো কূটনৈতিক সফলতা এখনও শূন্যের কোঠায়। ওই সময় (বিএনপি সরকার) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘে কোনো প্রস্তাব পাস করাতে পারেনি। । 

রাখাইনে মায়ানমার আর্মির জাতিগত গনহত্যা বন্ধে ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে ঢাকার ব্যাপক কুটনৈতিক তৎপরতা সত্বেও রাখাইনে জাতিগত নিধন অব্যাহত রেখেছে মায়ানমার সেনাবাহিনী। প্রতিদিন হাজার রোহিঙ্গা বর্মি সেনার অত্যাচার থেকে বাঁচতে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে।বর্তমান সরকারের দূরদর্শিতার ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্য্যায়ে সাড়া পেয়েছে।আন্তর্জাতিক সমর্থনে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার একটা স্হায়ী সামাধান বের করতে পারবে বলে আসাবাদী সকলে।কুটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে।কারণ বর্তমান সময়ের বাস্তবতা হচ্ছে যার যত বড় সামরিক শক্তি তার গুরুত্ত তত বেশী।যে কোন দেশের কুটনৈতিক সফলতার বড় ব্যারোমিটার হচ্ছে সামরিক শক্তি।
 

সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে সময় নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ইতিহাস বলে,মুসলিম সামরিক শক্তি অটোমান সাম্রাজ্য (তুর্কি খেলাফত) ধ্বংস করতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স বিরতিহীন চেষ্টায় ১৭০ বছর (প্রথম বিশ্বযুদ্ধে) পর সফল হয়। দিল্লির সিংহাসন দখলে নিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ১৫০ বছর অবিরাম ষড়যন্ত্ররে চেষ্টা করে সফল হতে হয়েছে। আমরা শুধু সংকট সামনে এলেই চিন্তা করি; কিন্তু ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হতে পারে তা বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন মনে করিনা।কার্যকর পরিকল্পনা ও কৌশল না থাকার কারণেই বার বার সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। রোহিঙ্গা সমস্যাটি তার জ্বলন্ত উদাহরণ। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন ও রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করছে ঠিকই; কিন্তু এও বলছে, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। এটা আমাদের বুঝেই সামনে অগ্রসর হতে হবে। চীন ও রাশিয়াকে দোষারোপ করে আমরা কোনো কিছু অর্জন করতে পারবো না। বরং আমাদের জন্য আরও বিপদ ডেকে আনতে পারে!  যে কোনো বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। আমাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য শক্তিশালী থাকলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের একটি গুলি করারও সাহস পেত না। প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে সেনাবাহিনীর আকার বড় করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার আলোকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যে দেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য যত বেশি শক্তিশালী, সে দেশের কূটনৈতিক সফলতার সুফল সহজেই পাওয়া যায়। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আমাদেরও চিন্তা করতে হবে। চীন-রাশিয়া আমাদের বন্ধু একথা মনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মিয়ানমারের আচরণ ঔদ্ধত্যপূর্ণ। রাখাইনে মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জাতিগত নিধনে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় বৌদ্ধরা। মিয়ানমারকে থামাতে হলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। একবার কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আমাদের ঝিমিয়ে পড়লে চলবে না, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। 
লেখক: সাংবাদিক

mushfiqurrahman2021@gmail.com
 

Comments

comments