ব্রেকিং নিউজ

আগস্ট: ঔপনিবেশিক দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্তির মাস

মুশফিকুর রহমান।।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে দেশীয় বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও জগৎশেঠ গংদের বেঈমানি ও প্রহসনের যুদ্ধে বাংলা বিহার উড়িস্যার স্বাধীন নবার সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। বাংলা ২০০ বছরের জন্য ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর দখলে চলে যায়।যুদ্ধে বাংলার নবাব তো পরাজিত হননি, পরাজিত হয়েছিলেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার জনগণ। সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে আসা বেনিয়াগোষ্ঠী বাংলাদেশে এসেছিল বাণিজ্যের জন্য, এ দেশের কিছু বিশ্বাস ঘাতকের জন্য সেই বেনিয়াগোষ্ঠীই হয়ে গেল রাজা। কালক্রমে সারা ভারতবর্ষই একদিন পদানত করেছিল।ফলে ২০০ বছরের জন্য সুবাহ্ বাংলার ভবিষ্যত বেনিয়া ইংরেজদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে চলে যায়।পরাধীনতার শৃংখলকে বরণ করতে হয় এদেশের আপাময় জনতাকে। ইংরেজদের দ্বৈত-নীতি ও লুটপাটের ফলে বাংলার মানুষ সর্বহারা শ্রেণীতে পরিণত হয়। ১৭৬৮-৭৩ মহা দূর্ভিক্ষে বাংলার এক তৃতীয়ংশ মানুষের মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ ২০০ বছরের উপনিবেশিক শাসন শোষন আর বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে উপমহাদেশে ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ)পাকিস্হানের অংশ হিসাবে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।সুচতুর ইংরেজ বাংলাকে স্বাধীনতা না দিয়ে ভারত ও পাকিস্হানের মধ্যে ভাগ করে পরাধীন করে রেখে যায়। ব্রিটিশদের অপশাসন থেকে মুক্তি লাভ করে এই দিন ১৪ ও ১৫ই আগষ্ট পাকিস্হান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।পর পর দুটি বিশ্বযুদ্ধের পর দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটিশ রাজশক্তি নিজেদের পুনর্গঠন এবং ক্ষয়ক্ষতি পোষানোর জন্যই এই উপমহাদেশকে স্বাধীনতা দিয়ে চলে যায়।দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে।বৃটিশরা স্বাধীনতা দিলেও বাঙালীরা আরেক উপনিবেশিক শক্তি পাকিস্হানের শাসনে নিগৃহিত হতে থাকে।

মীর জাফর ও জগৎশেট গংদের প্রহসনের যুদ্ধে নবার সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। বাংলা ২০০ বছরের জন্য ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর দখলে চলে যায়।পলাশীর যুদ্ধে শুধু নবাব সিরাজের পরাজয় ছিল না, সেই পরাজয় বাংলায় খেটে খাওয়া কৃষক,শ্রমিক মেহনতি মানুষকে ২০০ বছরের জন্য পরাধীনতার শৃংখল পরতে হয়েছে।ইংরেজদের দ্বৈত-নীতি ও লুটপাটের শাসন ব্যবস্হার ফলে বাংলার মানুষকে সর্বহারা শ্রেণীতে পরিণত করে।সুবাহ বাংলার পরে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোঃ একের পর এক পুরো ভারতবর্ষ প্রতিটি রাজ্য দখল করে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা করে।  সেই শাসন ভারতীয় জনগণের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিণতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছিল ১৯৪৭ এর ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতীয় ইউনিয়ন নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্নপ্রকাশ ঘটে।১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পূর্ব বাংলাতেও ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখানে ১৪ আগস্ট আর পালিত হয় না।

পাকিস্তান দুই অঞ্চল নিয়ে গঠিত হলেও পূর্ব পাকিস্তান হয়ে দাঁড়িয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর লুটপাটের ক্ষেত্র। প্রথম থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাব ছিল। আর এ কারণেই সৃষ্টি হয়েছিল সেই অবস্থা। পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ছিল ক্ষমতাসীন দল, কিন্তু মুসলিম লীগের মূল ও নির্ধারক নেতৃত্বের অবস্থান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ নেতারা পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের হুকুম মতোই চলতেন। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিমের শোষণ-নির্যাতন সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা বা দাঁড়ানোর কোনো ব্যাপার তাদের দিক থেকে ছিল না। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রায় সবটাই গঠিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা। তাতে বাঙালিদের উপস্থিতি ছিল নামমাত্র।

পাকিস্তান সরকারের আমলাতন্ত্রের উচ্চপর্যায়ের সব অফিসারই ছিলেন পাঞ্জাবি অথবা ভারত থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাওয়া লোকরা। করাচি ছিল পাকিস্তানের রাজধানী এবং সব ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। অর্থ ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা ইত্যাদি সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো সেখান থেকেই। তাছাড়া ভারত থেকে পাকিস্তানে আসা বড় ব্যবসায়ীরাও প্রায় সবাই গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। অর্থাৎ সব দিক দিয়েই ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ক্ষমতার ভারসাম্যের এই বড় রকম অভাবের কারণেই পূর্ব পাকিস্তান হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের শোষন আর লুচপাটের অধীন।

১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পূর্ব বাংলা থেকে পাকিস্হানি উপনিবেশিক শাসন উচ্ছেদ হয়।১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাক-বাহিনী আত্নসমর্পন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে অভ্যুদ্বয় ঘঠে। এ অঞ্চলের জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের শোষণ-নির্যাতনের পরিণতিতেই বাংালীরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে।পাকিস্হানীদের শোষন ও বৈষম্যর বিরুদ্ধে বাঙালীরা সংগ্রাম করেই স্বাধীনতার পতাকা শেষ পর্যন্ত চিনিয়ে আনে।

কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত ভূখণ্ডের জন্য ১৪ ও ১৫ আগস্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ দিবস। কারণ ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বাংলা ও ভারতের জনগনের অনেক আত্নত্যাগের বিনিময়ে ১৪ ও ১৫ আগস্টের মধ্যরাতে ভারতের জনগণের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম একটা পরিণতি লাভ করেছিল। দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হওয়া শাসকশ্রেণী ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতাসীন হলেও ব্রিটিশের ভারত ত্যাগের পরিস্থিতি ও শর্ত ভারতের জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং জনগণের অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছিল।

সাম্রজ্যবাদ শক্তি ব্রিটিশের ভারত ত্যাগের দিন হিসেবে এই দিবসের ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাব-এডিটর, দৈনিক আজকের সংবাদ

Comments

comments