ব্রেকিং নিউজ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রস্তাব: সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে আয়ের উৎস জানাতে হবে

savings

প্রতিবেদক:

সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র কিনতে আয়ের উৎস জানাতে হবে। এই বিধান চালু করতে সম্প্রতি সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে এখন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এর আগে একই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) থেকেও একই প্রস্তাব করা হয়েছে। এত দিন নানা চাপের মুখে এই বিধান করা না হলেও আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে সরকার এখন এটি করতে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে ৭ ধরনের সঞ্চয়ী উপকরণ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ৫ বছরমেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনতে আয়ের উৎস জানাতে হয়। বাকি ৬ ধরনের সঞ্চয়পত্র কিনতে আয়ের উৎস জানাতে হয় না। যে কেউ যে কোনো অর্থ দিয়ে এগুলো কিনতে পারে। ফলে এগুলোতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত আমাদের সময়কে বলেন, সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানো বা বাড়ানো কিংবা কেনার বিষয়ে প্রচলিত নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগটি ভালো। বিশেষ করে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ না দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া যারা নিম্নআয়ের মানুষ বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্তদের জন্য আয়ের এটি একটি ভালো মাধ্যম। ফলে এটি যাতে সবাই কিনতে না পারে সেদিকে নজর রাখা দরকার।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা টাকার উৎস জানানোর বিধান করার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। এই বিধান না থাকায় এখানে যেমন কালো টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে, তেমনি এসব অর্থে মানিলন্ডারিং হওয়ার সুযোগও রয়েছে। এ কারণে ব্যাংকের মতো সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও টাকার উৎস্য জানানোর বিধান করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। এর মধ্যে এপিজি এই চাপ দিচ্ছে বেশি। তবে সরকারের একটি মহলের বিরোধিতার কারণে এটি হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, ২০০২ সালের মে মাস থেকে বাংলাদেশে মানিলন্ডারিং আইন কার্যকর হয়েছে। সে কারণে ওই সময়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা এক সার্কুলারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে কালো টাকা জমা রাখার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে কালো টাকা জমা রাখার সঞ্চয়ী উপকরণ বিয়ারার সার্টিফিকেট অব ডিপোজিট (বিসিডি) বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় গ্রাহকের নাম-ঠিকানা ছাড়াই শুধু একটি কোড নাম্বারের ভিত্তিতে ব্যাংকে টাকা রাখা যেত। বর্তমানে ব্যাংকে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যে কোনো টাকা রাখলেই গ্রাহকের টাকার উৎস সম্পর্কে একটি ঘোষণা দিতে হয়। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা টাকাও ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হলে তার উৎস সম্পর্কে ঘোষণা দিতে হয়। সরকারি বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করলেই এ ব্যাপারে দিতে হয় আগাম ঘোষণা। কিন্তু সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্রগুলোর একটি ছাড়া বাকিগুলোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো ঘোষণা দিতে হয় না। এ কারণে সন্দেহ করা হয়, সঞ্চয়পত্রে মানিলন্ডারিংয়ের বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এসব টাকা আবার সন্ত্রাসী কর্মকা-েও চলে যেতে পারে।সূত্র জানায়, সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে টাকার উৎস জানানোর সরাসরি বিধান না থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই এ সম্পর্কে ঘোষণা চায়। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এগুলোকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমের আওতায় প্রতিমাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে টাকার উৎসের বিষয়টি এখানে চলে আসছে। আবার অন্যান্য সংস্থাও এখানে তদারকি করে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের একটি ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে। এর বেশি কেউ বিনিয়োগ করতে পারে না। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে গ্রাহকের ছবি লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব থাকতে হয়। এসব করতে জাতীয় পত্র লাগে। এসব বিধানের কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে মানিলন্ডারিং করার সুযোগ কম মনে করেন অনেকে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আমাদের সময়কে বলেন, পেনশনভোগী ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে সরকার সঞ্চয়পত্রে সুদহার নির্ণয় করে। কিন্তু এ সুবিধার যথেষ্ট অপব্যবহার হচ্ছে। সুবিধাভোগীর বাইরেও রয়েছে অনেকে। যারা এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয় তাদের বাদ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, অপব্যবহারকারী নির্ণয়ে বেশ কিছু বিষয়ে নজর দিতে হবে। সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে; তা সময়োপযোগী। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর ও ব্যাংকের তথ্যের সমন্বয় করতে হবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনার প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটালাইজ করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরুপাক্ষ পাল বলেন, এ ধরনের উদ্যোগের চেয়ে সুদের হার সমন্বয় করা প্রয়োজন। সাময়িক এ ধরনের উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না। এতে দুর্নীতি আরও বাড়বে। এ জন্য সুদের হার সমন্বয় করার পরামর্শ তার।

Comments

comments