ব্রেকিং নিউজ

৪ হাজার কোটি টাকার নতুন খেলাপি ঋণের সন্ধান

TAKA

প্রতিবেদক:
খেলাপি ঋণে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমান সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমান ৪ থেকে ৬ শতাংশ। সরকারি ব্যাংক গুলোতে এ হিসাবেও রয়েছে বড় ধরনের গরমিল। সম্প্রতি সরকারি খাতের চার ব্যাংকে পরিদর্শন করে আরও ৪ হাজার কোটি টাকার নতুন খেলাপি ঋণের সন্ধান পাওয়া গেছে। ব্যাংকগুলো তাদের তৈরি প্রতিবেদনে এটি গোপন রাখে। এর মধ্যে জনতায় ১৭৭১ কোটি, অগ্রণীর ৯২৭ কোটি, রূপালীর ৬৯১ কোটি ও সোনালী ব্যাংকে ৬৮২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ গোপন করার তথ্য ধরা পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করে ব্যাংকগুলো একদিকে নিজেদের দুবর্লতা আড়াল করছে, অন্যদিকে হিসাব জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। ৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কম দেখানোয় তাদের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এগুলো বের হওয়ায় এখন প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে কমে যাবে নিট ও পরিচালন মুনাফা।

ব্যাংকগুলোর নিজস্ব হিসাবে গত বছরের ডিসেম্বর শেষে সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর বার্ষিক কার্যক্রমের ওপর পরিদর্শন চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে আরও ৪ হাজার ৭১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য পাওয়া যায়। ওই ঋণগুলোকে খেলাপি হিসেবে বার্ষিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে ৪ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে আয় দেখাতে পারে না ব্যাংকগুলো; কিন্তু ওই ৪ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে আয় দেখিয়েছে। আর্থিক সূচকের অবস্থান ভালো তারা এ কাজ করেছে। এখন ওই ঋণের বিপরীতে দেখানো আয় হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে। ওই ঋণকে খেলাপি ঋণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ঋণগুলোর মান অনুযায়ী ২০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ ভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। অনেকক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে যোগসাজশ করে গ্রাহককে আরও ঋণসুবিধা বা অন্যকোনো সুবিধা পাইয়ে দিতে কর্মকর্তারা খেলাপি ঋণ গোপন করেন। কোনো ব্যক্তি খেলাপি হয়ে গেলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, জাতীয় বিভিন্ন পুরস্কারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হন না।

গ্রাহক সম্পর্কে তথ্য চাইলে কোনো কোনো ব্যাংক খেলাপি তথ্য গোপন করে নিয়মিত গ্রাহক হিসেবে উপস্থাপন করে। কয়েক বছর আগে নতুন একটি ব্যাংকের পরিচালক ও জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে এক প্রার্থীর বিষয়ে ভুল তথ্য দেওয়ায় জনতা ব্যাংককে কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ৩৬ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৪ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপস্থাপন করে জনতা ব্যাংক। জনতা ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করে আরও ১ হাজার ৭৭১ কোটি খেলাপি ঋণ খুঁজে পাওয়া যায়। পরিদর্শনে পাওয়া পরিমাণসহ ২০১৬ সালের বার্ষিক রিপোর্টে খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা দেখাতে বলা হয়। ব্যাংকের দেওয়া হিসাবে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বৃদ্ধির কারণে বার্ষিক রিপোর্টে এই হার দাঁড়াবে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ।

জনতা বাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবদুস সালাম বলেন, আমাদের হিসাব মতো একটি ব্যালান্সশিট প্রস্তুত করি। এটি পর্যবেক্ষণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। আমাদের হিসাবের বাইরে আরও ১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পেয়েছে। তাদের নির্দেশ মতো এটি বার্ষিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকাশ করেছি।দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করে অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটি তাদের পাঠানো হিসাবে ২৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২০ দশমিক ৪৩ শতাংশ বা ৫ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে দেখায়; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে আরও ৯২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পায়। বার্ষিক প্রতিবেদনে ৬ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ দেখাতে বলা হয়।

অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস-উল-ইসলাম বলেন, গুণগত বিচারে আমাদের কাছে অনেক ঋণকে খেলাপি মনে হয়নি; কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেগুলোকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ মোতাবেক সেগুলো উপস্থাপন করছি।

রূপালী ব্যাংক ২ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ দেখালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা পেয়েছে। ব্যাংক নিয়মিত দেখালেও ৬৯১ কোটি টাকা খেলাপি দেখাতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যাংকটির হিসাবে তাদের দেওয়া ১৬ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ খেলাপি বলে প্রদর্শন করেছে। কিন্তু পরিদর্শনের পর এই হার ২০ দশমিক ৬৪ প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সোনালী ব্যাংক তাদের দেওয়া হিসাবে ১০ হাজার ২২৯ কোটি খেলাপি ঋণ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করে আরও ৬৮২ কোটি টাকা বেশি পেয়েছে, যা ব্যাংক গোপন করে। বার্ষিক প্রতিবেদনে ১০ হাজার ৯১১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ দেখাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৩২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ব্যাংকের দেওয়া হিসাবে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়াসহ ধরলে এই হার বেড়ে দাঁড়াবে ৩৩ দশমিক ৪১ শতাংশে।সুত্র আমাদের সময়।

Comments

comments