ধর্মহীন এবং ধর্মসন্দেহ

photo yamin
ইয়ামিন আরচুভ:
অধর্ম থেকে সমাজকে রক্ষার প্রয়োজনে ধর্ম তৈরি হয়েছিল নাকি ধর্ম তৈরি হয়েছিল বলে সমাজ অধর্ম থেকে রক্ষা পেয়ে এক ধরনের সভ্যতার মুখ দেখেছিল তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। ধারণা করা হয় সকল ধর্মীয় মতবাদগুলো মানবিকতা এবং সুবিচারকে কেন্দ্র করে ।
প্রত্যেকে তার নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম ভাবে এবং যে ধর্ম মানে না সেও তার এই না মানাকে শ্রেষ্ঠ ভাবে, এই সহজ সত্যটা কোন ধর্মের বিশাল অংশের  মানুষ স্বীকার করতে রাজি না। প্রত্যেকের এই ধর্ম বিশ্বাস তাকে শক্তি জোগায়, সাহায্য করে , দৈনন্দিন কাজ সহজ করে, আশা তৈরি করে, তাকে ভালো রাখে। জেনে হোক  না জেনে হোক ,বুঝে হোক আর না বুঝে হোক , হয়ত ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ না পাওয়ায় জন্মগত ভাবেই  কোন ধর্ম  তাকে লুফে নিয়েছে। তবুও আশার আলো হচ্ছে এই যে, ধার্মিক মতবাটুকুই তাকে ভালো রেখেছে। ধর্ম পালন করা বা না করার অধিকার সবার আছে। প্রশ্ন হল কে বা কারা অধিকার দিয়েছিল বা দিচ্ছে ? কে বা কারা অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিল অথবা ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে? এই অধিকার একবিংশ শতাব্দী দিয়েছে নাকি একবিংশ শতাব্দীর নতুন সমাজ ব্যবস্থা দিয়েছে? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে একটু ভিন্ন উপায়ে। একবিংশ শতাব্দীর সমাজ ব্যবস্থা এই অধিকারগুলো কখনো  দিতে পেরছে আবার কখনো দেয়ার চেষ্টা করছে।  ধর্ম পালন না করা আর ধর্মকে অপমান করা যেমন এক না তেমনি ধর্মকেন্দ্রিক অধর্ম আর অসভ্য বর্বরতাও ভিন্ন কিছু  না। ধর্মভীরুদের লক্ষ্য করে কেউ হয়ত বলে উঠবে যে, প্রত্যেকের বাকস্বাধীনতা আছে, যে যা ইচ্ছা বলতে পারে , কেউ কিছু বললে তাকে  যৌক্তিক উত্তর দিতে হবে। কথায় কথায় বিতর্ক হতে পারে, কথা বললেই খুন হতে পারে না।তাহলে কোন মেয়েকে যদি কেউ বাজে কথা বলে , ইভটিজিং করে তাহলে কেন রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়? ইভটিজার রাও তো শুধু কথা বলে মেয়েদের অপমান করে।

ঈশ্বরে বিশ্বাসীরা অপরাধী হোক আর যাই হোক তাকে ঈশ্বর প্রথমত রক্ষা করবেন এবং দ্বিতীয়ত ক্ষমা করবেন , এই আশা করে না এমন কোণ অপরাধী নেই। ব্যপারটা অনেকটা এরকম যে, মন্ত্রীর ছেলে যতই কু কাজ করুক মন্ত্রী চাইবে তাকে ক্ষমা  এবং রক্ষা করতে। আর যে মন্ত্রীর ছেলে না সে অল্প অপরাধে বিশাল সাজা পেলেও মন্ত্রীর ভ্রুক্ষেপ নেই।
যে তার নিজের ধর্মের বিরুদ্ধে  কিছু শুনলেই খুন করতে বের হয়ে  যায় তাকে  বিশ্বাসী বলা যায়  না, তাকে অবিশ্বাসীও বলা যায় না,  তাকে  সন্দিহান বলা যায়। অবিশ্বাসী হলে  সে  এসব বিষয়ে মাথা ঘামাত  না, আর বিশ্বাসী হলে তো কারো কথায় কিছু আসে যায় না,  সে জানে  সত্যিটা কি। বিশ্বাস কখনো শতকরা দশ ভাগ  হয় না, বিশ্বাস সবসময় শতভাগ হয়, এই বিশ্বাসকে কখনো নাড়ানো যায় না, সন্দেহকে নাড়ানো যায়। আর  অন্যের কথায় বিশ্বাস টালমাটাল হয়ে যাওয়ার ভয়ে যখন কেউ কাউকে বধ করতে চায় তখন তাকে বিশ্বাসী বলা যায় না, সে কখনো বিশ্বাসীই ছিল না, সে ছিল সন্দিহান।
সামর্থ্য শক্তি এবং প্রভাব থাকলে মানুষ কখনোই কোন অবিচার সহ্য করে না, আর  সামর্থ্য শক্তি এবং প্রভাবের অভাবে মানুষ সকল অবিচার কে মুখ বুজে সহ্য করতে পারে এই ধর্মীয় শক্তির কারণে । চোখের সামনে শত অবিচার হলেও সে সহ্য করতে পারে, সে জানে শত বিচারের পরেও  কোন বিচার আছে। একজন ধর্মাচারহীন মানুষের চোখে এটা সান্ত্বনা মনে হলেও একজন ধর্মভীরু মানুষের কাছে এটা সান্ত্বনার চেয়ে বেশী কিছু। "ধর্মাচারহীন" শব্দটা ব্যবহার করার উদ্দেশ্য হল , ধর্মের আচার বিধি মেনে চলে না তবে ঈশ্বরকেও অবিশ্বাস করে না এরকম মানুষকে আমরা নাস্তিক বলতে পারি না। বেশিরভাগ ধর্মভীরু মানুষ ঈশ্বরকে বিশ্বাসের নামে শুধু সমর্থন করে। সমর্থন করতে হলে বিশ্বাস করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। সমর্থন মানুষ ভয়ে করতে পারে , লোভে করতে পারে ইত্যাদি। তবে সমর্থনের সাথে বিশ্বাসের একটা নিগূড় সম্পর্ক আছে, যেমন- জাহান্নামের ভয়ে অথবা জান্নাতের লোভে সে ঈশ্বরে সমর্থন করা শুরু করেছে। জাহান্নামকে ভয় পেতে হলে জাহান্নামেকে বিশ্বাস করতে হবে এমন ধারনা কিছুটা দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেলার মত। সাধারণত ভয় পেতে মানুষকে কোন কিছু বিশ্বাস করতে হয় না, সন্দেহ করলেই চলে যেমন- ভূতের ভয়, ভবিষ্যৎ সুখ হারানোর ভয়,ইত্যাদি । এই ভয়গুলো আমাদের জীবনাচার ক্ষনিকের জন্য পরিবর্তন করতে পারলেও এগুলোকে মোটেও জীবন পরিবর্তনকারী বিশ্বাস বলা যায় না। আর এই বিশ্বাসের অভাবে আর সন্দেহের প্রভাবে সে কখনো মনবিক আচরণ করে আর কখনো নানা ধরণের অজুহাত দেখিয়ে মানবিকতা উপেক্ষা করে ধর্মের নামে একটা অধর্মীয় নৈতিকতা স্থাপন করতে চায়। ধর্ম  কখনো শাসনে সাহায্য করেছে, কখনো কোন ধর্মকে কেন্দ্র করে সাধারন মানুষ শোষিত  হয়েছে। ধর্মাচারহীনরা ভাবছে ধর্ম একসময় অধর্ম এবং অবিচার থেকে কিছু মানুষকে আলাদা করে শান্তি সভ্যতা দিয়েছে আর একবিংশ শতাব্দীতে শান্ত সভ্য মানুষকে আলাদা করার জন্য অসভ্য করে তুলছে। ধর্মভীরুরা ভাবছে ধর্ম না থাকলে নৈতিকতা কোথায় থাকবে? কেন মানুষ ভালো কাজ করবে?
একদল ভাবছে ধর্মের অস্তিত্ব থাকার অস্বস্তি নিয়ে আর একদল চিন্তিত ধর্মশূন্য পৃথিবীর কি হবে তা নিয়ে। দুই দলই ভয়ে আছে। যারা নাস্তিক, ধর্মাচারহীন এবং যারা ধর্মভীরু তাদের সবার উদ্দেশ্য কি এক? সবাই কি পৃথিবীকে তাদের বাসযোগ্য  এবং সভ্য করে তোলার জন্য অন্য মতবাদীদেরকে ধূলোয় মিশিয়ে দিতে চাচ্ছে? নাস্তিক এবং আস্তিকদের মতবিরোধ বহু আগের। সাধারণত আস্তিকরা বলে কোন মানব শিশু নাস্তিক হয়ে জন্মায় না। আর নাস্তিকরা বলবে যে কোন মানব শিশু ঈশ্বর বোঝে না, তাকে বোঝানো হয়। যে আগুন আর পানির পার্থক্য বোঝে না সেই সময়ে সে ঈশ্বরকে কি করে বুঝবে? আস্তিকরা বলে , নাস্তিক জন্ম থেকে হয় না, মানুষ কখনো নাস্তিক হয়ে যায়।যদিও পৃথিবীর বেশিরভাগ অপরাধী আস্তিক, চোর চুরি করতে গেলে তার ঈশ্বরকে ডাকে যেন সে ধরা না পড়ে। ধর্মের চোখে চুরি যেমন একটা অনৈতিক কাজ তেমনি চোর ধরা পড়ার ভয়ে শেষ ভরসা হিসেবে তার ঈশ্বরের  কাছে সাহায্য চায় রেহাই পাওয়ার জন্য। কখনো সে ধরা পড়ে কখনো পড়ে না। যখন চোর ধরা পড়ে  না তখন চোরের মনে ধারণা জন্মায় যে সে ঈশ্বরের কৃপায় এবারের মত বেচে গেছে। ঈশ্বর তার বিধি বিধানে চুরি নিষেধ করেছেন, তার মানে চোর যতই ঈশ্বরকে ডাকুক ঈশ্বর তার বিধি বিধানের নৈতিকতার কারনেই চোরের ডাকে সাড়া দেয়ার কথা না। অথচ চোরটা সারাজীবন এটা ভেবেই শক্তি পেয়েছে যে ঈশ্বরই তাকে সাহায্য করেছে।  "ঈশ্বর তোমাকে কেন  সাহায্য করবে?" জিজ্ঞেস করায় এক চোর উত্তর দিয়েছিল যে, "মুই তো আর স্বাদে গরীব ঘরে হই নাই,যেহানে রিজিক রাখছে হেইহানে তো যাওয়াই লাগবে "। প্রায় প্রত্যেক ডাকাত, ধর্ষক, চোর এবং অন্যান্য অপরাধীর ধর্ম আছে , ঈশ্বর আছে। তাহলে কেন তারা অপরাধ করে? ঈশ্বরতো তার বিধি বিধানগুলোতে  কখনো অপরাধ করতে বলেনি। অপরাধীরা ঈশ্বরের "ক্ষমা" এবং "দয়ালু"  জাতীয় গুনগুলোর সুযোগ নিচ্ছে? নাকি ক্ষমা পাওয়ার প্রতিশ্রুতির কারনে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে বলে সে অপরাধ প্রবণতায় জড়াচ্ছে? যার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে ,শোষন করা হচ্ছে সেও ঈশ্বরকে ডাকছে, আর যে শোষন করছে সেও ডাকছে। পৃথিবীর বহু শোষকের বিচার পৃথিবীতে হয়নি। হয়ত কোন এক বিচারে সকল শোষক আসামীর কাঠগড়ায় দাড়িয়ে শান্ত করবে আজকের শোষিতের চোখের উত্তপ্ত জল। ঈশ্বরের এই অসমাপ্ত বিচারকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে নানা ধরণের মতবাদ। সবাই সবার মতামত এবং  মতবাদকে শ্রদ্ধা জানাব নাকি সবাই অন্যের মতবাদকে অপমান করতেই থাকব?
যে যাই ভাবুক তাতে কিছু আসে যায় না যতক্ষন না সেটা শ্রীহীন ভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। সভ্যতার খাতিরে, পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার খাতিরে সকল মতবাদকে শ্রদ্ধা করতে শেখাটাই কাম্য। সবাইকে সম্মান করা এবং কারো নিজস্ব শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ না করতে চাওয়াটাই সভ্যতা। এক যৌক্তিক মতবাদ যদি অন্য মতবাদের সাংঘরষিক হয় তবে আমাদের উচিত সভ্যতার স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেয়া।
সকল মতবাদের সহাবস্থান কোন ভাবে যদি সম্ভব হয় তবেই একমাত্র পৃথিবী বাসযোগ্য হবে অন্যথায় এই "ধর্মহীন এবং ধর্মসন্দেহ" মানুষকে স্বজাতির প্রতি বর্বরতা চালানোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে। তখন এই অসভ্য বর্বরতার দাপটে আমরা আবারো হয়তো ভুলে যাব, "ধর্মই সর্বোচ্চ মানবতা নাকি মানবতাই সর্বোচ্চ ধর্ম"।

ইয়ামিন আরচুভ
ডকুমেন্টারী নির্মাতা

Comments

comments