ব্রেকিং নিউজ

ফুটপাতে যৌন উত্তেজক ওষুধ, বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি

sex-1017-thebdexpress

দ্য বিডি এক্সপ্রেস ডটকমঃ

নারী-পুরুষের গোপন ও কঠিন যৌন রোগের সমাধান নিমেষেই’- এমন সব প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নানারকম ওষুধ। যৌন উত্তেজক ওষুধের নামে রাস্তার পাশে বিক্রি করা এসব ভেজাল ওষুধ মানবদেহের জন্য মারাত্মক

ক্ষতিকর হলেও অজ্ঞতার কারণে অনেকেই তা কিনছেন। আর এই ওষুধ সেবন অথবা ব্যবহারকারীরা হার্ট ও কিডনির জটিলতা, ডায়াবেটিসসহ নানা গুরুতর রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি এই ওষুধ সেবনের ফলে বাড়ছে ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিও।বুধবার বিকেল ৫টা। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডের রেললাইনের পাশেই চলছে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রির কারবার। মাইকিং করে বিক্রি করা হচ্ছে এসব ওষুধ। নেই চিকিৎসক, নেই কোনো চিকিৎসকের চেম্বার বা পরামর্শপত্র, এমনকি রোগনির্ণয়ে প্রয়োজন হচ্ছে না কোনো ধরনের শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবুও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে এই ওষুধ। রোগ বলতে শুধু একটাই- ‘নারীপুরুষের গোপন, জটিল ও কঠিন রোগ’!

আজ এখানে, কাল ওখানে ওষুধের পসরা নিয়ে বসে যাওয়া ভবঘুরে বিক্রেতাদের চতুরতা ও মিষ্টি কথায় ভুলে প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ। যারা এগুলো বিক্রি করছেন, তাদের অধিকাংশই অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মধ্যবয়স্ক বা তরুণ।

জানা গেছে, বিদেশ থেকে চোরাইপথে আনা ভায়াগ্রাসহ বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ গুঁড়ো করে এর সঙ্গে আটা-ময়দা ও নানারকম রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হয় এসব ওষুধ। তারপর এগুলো ‘হারবাল’ বা ভেষজ ওষুধ হিসেবে রাজধানীসহ সারাদেশে বাজারজাত করা হয়। ওষুধের মোড়কে নারী-পুরুষের আকর্ষণীয় ছবি ও নানা তথ্য দিয়ে প্রতারকরা এগুলো বাজারে ছাড়ে। আর না জেনে এগুলো কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন নানা বয়সের অসংখ্য নারী ও পুরুষ। প্রতিটি ওষুধের দাম নেওয়া হচ্ছে একশ' থেকে পাঁচশ' টাকা পর্যন্ত। আর এভাবেই প্রতারক চক্র মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি করেন রমজান আলী। তিনি বলেন, ‘এইগুলান হারবাল ওষুধ, মাইনষের ভালোর জন্যই বিক্রি করি। আগে এইগুলান গুলিস্তানে বেচতাম। এহন এইহানে বিক্রি করতাছি। প্রত্যেকদিন বিকাল ৪টার পর থেইকা বিক্রি শুরু করি।’

দিনে ওষুধ না বিক্রি করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এইগুলান রাইতে বেশি বেচাবিক্রি হয়।’

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিক্রি করা ঠিক কিনা জানতে চাইলে রমজান বলেন, ‘পেট এতকিছু বুঝে না। ব্যবসা করি, চুরি করি না। এমনে কি বেচাবিক্রি হয়? টাকা দিলে সবই হয়।’
 কাকে টাকা দেন বা কেন দেন জিজ্ঞেস করলে উত্তরে রমজান বলেন, ‘কারে দেই বুঝেন না? যারা নেয়, তাগোরেই দেই।’

রমজানের পাশেই দাঁড়িয়ে ওষুধ দেখছিলেন একজন ক্রেতা, নাম মো. জহির। পেশায় তিনি রিকশাচালক। কী দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কী আর দেখমু। যা দেহাইতাছে তাই দেখতাছি। বুঝবার চেষ্টা করতাছি কী ওষুধ বিক্রি করতাছে।’

এসময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন একজন নারী পথচারী। তিনি সেনানিবাস এলাকায় থাকেন, কর্মক্ষেত্র বসুন্ধরা আবসিক এলাকায়। পথেঘাটে এসব ওষুধ বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এরা ওষুধ বিক্রি করে তো অপরাধ করেই, আবার মাইকিং করে নানারকম আজেবাজে কথাও বলে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এসব শুনতে ভীষণ খারাপ লাগে। নিজের কাছেই লজ্জা লাগে। এদের শাস্তি হওয়া উচিত। এখানে পুলিশ ডিউটি করছে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় না।’

পাশেই রয়েছে একটি চায়ের দোকান। নাম মুকুল মিয়া। তিনি বলেন, ‘প্রায় চারমাস হইলো রমজান এইহানে ব্যবসা করে। আমরা দেখবারও যাই না। ওই আর কি, ওর এক হাজার টাহা ইনকাম হইলে পাঁচশ' টাহা পুলিশের।’
আপনিও কি এভাবে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করেন? এ প্রশ্নের উত্তরে মুচকি হেসে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন তিনি।

এসব ওষুধ সেবনের ফলে মানবদেহে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম মাসুদ চৌধুরী বলেন, ‘রাস্তার ধারে বিক্রি হওয়া যৌন উত্তেজক ওষুধ মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব ওষুধ ব্যবহারে হার্ট ও কিডনির জটিলতা ও ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে। এসব নকল ও ভেজাল ওষুধ ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা সাময়িক যৌন উত্তেজনা অনুভব করলেও দীর্ঘদিন ধরে এগুলো ব্যবহার করলে যৌনক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে লিভার, কিডনির অসুখসহ অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। এমনকি এসব ওষুধ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং এভাবে অবধারিত মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।'

কুড়িল বিশ্বরোডে রেললাইনের পূর্ব দিকে ১০ থেকে ১৫টি অস্থায়ী দোকান রয়েছে, যেগুলো রেললাইনের একদম গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে। চলছে চা বিক্রি থেকে শুরু করে কাপড়, জুতা, শরবত, কাবাব বিক্রিসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা। এই অস্থায়ী দোকানগুলো কিছুদিন আগেই উচ্ছেদ করা হলেও এখন আবার পুরোদমে চলছে ব্যবসা। অস্থায়ী দোকানগুলোর জন্য রেললাইন পারাপারে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় পথচারীদের। ফলে প্রায়ই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

কথা হয় র‌্যাব হেডকোয়ার্টারের সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নকল ও ভেজাল ওষুধ প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যক্রম চলছে। অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ তৈরির কিছু প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরির অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতারকরা নামিদামি কোম্পানির ওষুধের নাম করে নিজেদের তৈরি ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করছে। বিভিন্ন বস্তি, পুরান ঢাকার খুপড়িঘরসহ অনেক এলাকায় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এসব ওষুধ তৈরি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধরনের খবর পাওয়ামাত্রই অভিযান পরিচালনা করে থাকি। আপনি যেহেতু বিষয়টি জানিয়েছেন, অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Comments

comments