ব্রেকিং নিউজ

৪২ অভিন্ন নদী থেকে পানি প্রত্যাহার করছে ভারত

border_river-thebdexpress

দ্য বিডি এক্সপ্রেস ডটকমঃ

ভারত থেকে আসা ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর ৪২টিতে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত।টিপাইমুখ ও সারির উজানে বাঁধ দিয়ে আরও ৮টি নদীর পানি প্রত্যাহার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে তারা। ফলে শুকনো মৌসুমের শুরুতেই বড় বিপর্যয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সদস্যদের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে প্রাকৃতিক বিভিন্ন উত্স থেকে প্রতিবছর ৬ হাজার ৫০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি পাওয়া যায়। আগামী ২০২৫ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে তাদের সর্বোচ্চ ৯০০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রয়োজন।

অর্থাত্ মোট পানির শতকরা ১৫ ভাগ তাদের পক্ষে ব্যবহার সম্ভব। এরপরও বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্যই ভারত একতরফা যৌথ নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

জাতিসংঘের অভিন্ন নদীবিষয়ক ‘কনভেনশন অব দ্য ল অব নননেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকোর্সেস’-এ বাংলাদেশকে স্বাক্ষর করার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, বিশ্বের ৩৪টি দেশ এতে স্বাক্ষর করেছে, ৩৫টি দেশ হলে তা একটি আইনে পরিণত হবে। এটি আইনে পরিণত হলে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আইনি লড়াই চালাতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ৬০টি নদী ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের হিসাবে আন্তঃসীমান্ত নদী ৫৭টি। এরমধ্যে ৫৪টি নদী ভারত থেকে, ৩টি মিয়ানমার থেকে আসা।

যৌথ নদীগুলোর বড় কয়েকটিতে স্থায়ী বাঁধ; উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের ছোট নদীগুলোত অস্থায়ী মাটির বাঁধ দিয়ে শুকনো মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। বর্ষায় সেগুলো ভেঙে দেয়।

একতরফা পানি আগ্রাসনের ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ নদী শুকিয়ে যাচ্ছে; দেশে বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে যেখানে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল বিআইডব্লিউটি’র হিসাবে, এখন তা বর্ষা মৌসুমে ৬ হাজার ও শুকনো মৌসুমে ২৪০০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।

জানা গেছে, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা ও মহানন্দাসহ হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও উপনদীতে ৫০০টি বাঁধ তৈরি করছে ভারত। ইন্টিগ্রেটেড বিদ্যুত্ প্রকল্পের নামে এসব বাঁধে অর্থায়ন করছে ভারত সরকার।

এর আওতায় ভারতে ৪৫০টি, নেপালে ৩০টি ও ভুটানে ২০টি বাঁধ তৈরি করা হবে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের প্রায় ১০০টি বাঁধ নির্মাণ হয়ে গেছে। জাতিসংঘের পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস আই খান জানান, এ প্রকল্পে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

কিন্তু ভারত রাজি হয়নি। এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হলে বাংলাদেশের বিদ্যুত্ সমস্যার স্থায়ীভাবে সমাধান সম্ভব হতো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাথাভাঙ্গা, বেতনা (সোনামুখী), ভৈরব, রায়মঙ্গল, ইছামতি—এ ৫টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর প্রবাহের ওপরই নির্ভর করে সাতক্ষীরা-যশোর এলাকার অন্যান্য নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ।

ভারতের নদীয়া জেলার করিমপুর থানার গঙ্গারামপুরের ৮ কিলোমিটার ভাটিতে সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি ভৈরব নদের উত্সমুখে একটি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ওই বাঁধের উজানে ভৈরব নদের উত্সমুখ জলঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেগুলেটর।

ওই বাঁধ এবং রেগুলেটর দিয়ে ভারত জলঙ্গী নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করছে। ফলে ভাটিতে বাংলাদেশে ভৈরব নদ মরে গেছে। ভৈরব বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে মেহেরপুর সদর ও গাংনী এলাকা দিয়ে। মিলেছে রূপসা নদীতে। ভৈরব শুকিয়ে যাওয়ায় পানি পাচ্ছে না কপোতাক্ষ।

কপোতাক্ষ ভরাট হয়ে পড়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতাসহ মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে।

রায়মঙ্গল সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এ নদী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভক্ত করেছে সুন্দরবনকে। ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে নদীশাসনের উন্নত কলাকৌশল প্রয়োগ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের দখল নিতে চাইছে ভারত।

আন্তর্জাতিক পানিবিশেষজ্ঞ মরহুম বিএম আব্বাস এটি তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, ভারত ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সীমান্তের আনুমানিক ১০০ থেকে ১২৫ ফুট ভেতরে সুচিয়া গ্রামে নদীর ওপর ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসবিশিষ্ট চার ফোকরের স্লুইসগেট নির্মাণ করে।

শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে সেচ কাজে ব্যবহার করে। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বাড়লে হঠাত্ পানি ছেড়ে দেয়। এভাবে পানি আটকে রেখে প্রত্যাহার করায় পানির অভাবে বাংলাদেশের বেতনা ও কোদালিয়া নদীর মধ্যবর্তী ৩০ বর্গমাইল এলাকা শুকিয়ে যায়।

বর্ষায় পানি ছেড়ে দিলে ওই এলাকায় প্লাবন দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কালিন্দি রায়মঙ্গল নদীর স্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারত দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের দখল নিতে চাইছে।

সীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা গঙ্গার একটি প্রধান শাখা। এ নদীটি প্রত্যক্ষভাবে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবের শিকার। ফারাক্কা ব্যারাজ হওয়ার পর নদীটি দিনে দিনে মরা গাঙে রূপ নিয়েছে। ফলে এর বিশাল অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয় নেমে এসেছে।

বাংলাদেশের প্রধান নদী গঙ্গা-পদ্মা। এ নদীতে বর্ষা মৌসুমে ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ পানি আসে নেপাল থেকে। শুকনো মৌসুমে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ। ১০ ভাগ পানি আসে চীন এবং ২০ ভাগ আসে ভারত থেকে।

অথচ ভারত ফারাক্কা বাঁধ ও এর উজানে আরও বেশ ক’টি বাঁধ ও রেগুলেটর তৈরি করে একতরফা পুরো পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভারতের পানি মাত্র ২০ ভাগ; অথচ তারা শুকনো মৌসুমে পুরো নদীর মালিক সেজে সম্পূর্ণ পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই শুকিয়ে যেতে থাকে পদ্মা। আর দুর্ভোগ শুরু হয় পদ্মাপাড়ের এসব মানুষের। শুধু পদ্মার পশ্চিম সীমান্তের চর এলাকার মানুষই নয়; অভিন্ন নদী গঙ্গার উজানে নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে পানি প্রত্যাহারে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটিতে বাংলাদেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও।

বিপদে পড়েছেন পুরো বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যে পানি চুক্তি করেছে তাতে পুরো প্রবাহ হিসাব না করে ফারাক্কা পয়েন্টে প্রাপ্ত পানির হিসাবে এবং পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় গঙ্গা শুকিয়ে এর অববাহিকায় বড় বিপর্যয় তৈরি করেছে।

গুগল আর্থ ম্যাপে দেখা যায়, ফারাক্কার উজানে গঙ্গার ভরা যৌবন আর ভাটিতে গঙ্গা মৃত। গঙ্গার পানি কৃত্রিম ক্যানেল হয়ে চলে যাচ্ছে ভাগিরথিতে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান নদী ও অন্যতম সীমান্ত নদী মহানন্দা বাংলাদেশে দুটি অংশে বিভক্ত। পঞ্চগড় অংশে মহানন্দা আপার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহানন্দা লোয়ার। মহানন্দার উত্পত্তি ভারতের দার্জিলিং জেলার মহলড্রিম পর্বত থেকে।

উপরের অংশে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত থেকে শুরু করে ভাটিতে ১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা নির্ধারণ করেছে মহানন্দা আপার। তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের কাছ দিয়ে নদীটি আবার ভারতে প্রবেশ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা হয়ে মহানন্দা আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার গিলাবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই অংশ মহানন্দা লোয়ার নামে পরিচিত। ভোলাহাট থেকে মহানন্দা, গোমস্তাপুর, নবাবগঞ্জ সদর ও রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলা হয়ে পদ্মায় মিলেছে।

৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী শুকিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে এর ১৩শ’ বর্গকিলোমিটার এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। ভারত মহানন্দার উজানে পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ার অদূরে বাংলাবান্ধা সীমান্ত ঘেঁষে একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে।

ফলে ভাটিতে মহানন্দা শুকিয়ে গেছে। বাঁধে সংযুক্ত করা হয়েছে ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা-মহানন্দা সংযোগ চ্যানেল।

এ চ্যানেলের সাহায্যে ভারত মহানন্দা ব্যারাজ থেকে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৫টি নদীর পানি একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে। যার পরিণতিতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সঙ্কট আর বর্ষায় বন্যা দেখা দেয়।

সীমান্ত নদী পাগলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে বাংলাদেশে প্রবেশ করে চাঁপাই সদরে মহানন্দায় মিশেছে। উজানে ভারতের অংশে স্লুইসগেট করে সেচের জন্য পানি প্রত্যাহার করায় ৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী শুকনো মৌসুমে থাকে পানিশূন্য। যার কারণে চরম দুর্ভোগে পাগলার ৪০০ বর্গকিলোমিটার অববাহিকার মানুষ।

নওগাঁর নদ-নদীতে পানি প্রবাহের মূল উত্স ছোট যমুনা। এর মাতৃনদী ঘুকশি। ভারত জলপাইগুড়ি জেলার মেকলিগঞ্জ থানার কাশিয়াবাড়িতে বাঙ্গু নদীর ওপর একটি রেগুলেটর ও বালুর ঘাটের ঝিনাইপোজে অপর একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে।

তিস্তা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী। বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্দায় তিস্তা ব্যারাজের ১০০ কিলোমিটার ও বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবার তিস্তা নদীর ওপর একটি বহুমুখী বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত।

১৯৭৫ সালে ওই প্রকল্প শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর আওতায় দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, মালদহ, জলপাইগুড়ি, কুচবিহার জেলা, বিহারের পুর্নিয়া ও আসামের কিছু এলাকার ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সরবরাহ করা হচ্ছে।

Comments

comments