ব্রেকিং নিউজ

হবিগঞ্জে চার শিশু হত্যার ঘটনায় পিতা-পুত্রের ১০ দিনের রিমান্ড

hobigonj-thebdexpress

দ্য বিডি এক্সপ্রেস.কম।।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার দুই পঞ্চায়েতের পূর্ববিরোধের জের ধরে চার শিশুকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার পিতা-পুত্রকে ১০ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তারা হলো—বালাগ পঞ্চায়েতের সর্দার আবদুল আলী বাগাল ও তার ছেলে জুয়েল মিয়া। বুধবার সকালে চার শিশুর মাটিচাপা দেওয়া লাশ উদ্ধারের পর রাত সাড়ে ৯টায় বালাগ ও জুয়েলকে গ্রেপ্তার করে বাহুবল থানা পুলিশ। এ ছাড়া চার শিশু হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গতকাল বৃহস্পতিবার আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা হলো আবদুল আলী বাগালের আরেক ছেলে রুবেল, একই গ্রামের আজিজুর রহমান আরজু ও বশির মিয়া। হবিগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদুর রহমান মনির জানান, বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সময় বাহুবল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পৃথক টিম তাদের গ্রেপ্তার করে। শুক্রবার তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হবে। আদালতে তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ড প্রার্থনা করা হবে বলেও তিনি জানান। সুন্দ্রাটিকি গ্রামে খুন হওয়া চার শিশুর স্বজনদের কান্না থামছে না। গ্রামের মানুষও নির্বাক হয়ে পড়েছে। গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে শোক ও উৎকণ্ঠা। নিহত চার শিশুর তিনজনই স্থানীয় সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। মনির মিয়া প্রথম শ্রেণি, জাকারিয়া আহমেদ শুভ দ্বিতীয় শ্রেণি এবং তাজেল মিয়া চতুর্থ শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। শুভ ছিল ক্লাসের সেকেন্ড বয়। তিন ছাত্রের মৃত্যুতে স্কুলে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাজিদুল ইসলাম জানান, চার শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই স্কুলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অনেক কমে যায়। বুধবার লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে নিয়ে যান। বৃহস্পতিবারও হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী স্কুলে আসে। আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কমে গেছে। অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় উপস্থিতি কম বলে জানিয়েছেন তিনি। শিশুদের আতঙ্ক কাটাতে এবং স্কুলে উপস্থিতি বাড়াতে গতকাল দুপুরে বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র। তিনি সবাইকে স্কুলে আসতে আহ্বান জানান এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। চার শিশু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মুক্তাদির আলম গতকাল দুপুর দেড়টায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া পিতা-পুত্রকে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাউসার আলম আসামিদের ১০ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। গত শুক্রবার বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মো. ওয়াহিদ মিয়া তালুকদারের ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), তার চাচা আবদুল আজিজ তালুকদারের ছেলে তাজেল মিয়া (১০), আব্দাল মিয়া তালুকদারের ছেলে মনির মিয়া (৭) এবং তাদের প্রতিবেশী আবদুল কাদিরের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১০) নিখোঁজ হয়। ওই দিন বিকেলে তারা পাশের উত্তর ভাদেশ্বর গ্রামে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়েছিল। এ ব্যাপারে পরদিন ওয়াহিদ মিয়া বাদী হয়ে বাহুবল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পুলিশের একাধিক টিম ও র‌্যাব মাঠে নামে শিশুদের সন্ধানে। সোমবার বিকেলে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানদাতাকে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করা হয়। মঙ্গলবার রাতে নিখোঁজ শিশু মনির মিয়ার বাবা আবদাল মিয়া বাদী হয়ে বাহুবল মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। বুধবার সকালে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের দিনমজুর কাজল মিয়া করাঙ্গী নদীর পাশে মাটি কাটতে গিয়ে মাটিচাপা অবস্থায় চার শিশুর লাশ দেখতে পান। পরে লাশগুলো উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত শেষে ওই দিন রাতে দাফন করা হয়। এলাকাবাসী ও অন্যান্য সূত্র গ্রামের বাগাল পঞ্চায়েত ও তালুকদার পঞ্চায়েতের বিরোধকেই এই নৃশংস ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছে। প্রাথমিক তদন্তেও বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হবিগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদুর রহমান মনির জানান, ঘটনার দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁরা আশাবাদী। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে প্রাথমিক তথ্য ও এলাকাবাসীর ধারণা থেকেই ক্লু বের করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম, সিআইডি, এসবি, ডিবি, র‌্যাব কাজ করছে। হবিগঞ্জ-সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিলা এমপি কেয়া চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এলাকায় এসে শুনতে পেয়েছি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি আছে। যদি গাফিলতি থাকে তাহলে অবশ্যই খতিয়ে দেখবে সরকার।’ তিনি বলেন, সরকার এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এই ঘটনা মানবিকতার বিপর্যয়। এই বিপর্যয় রোধ করতে প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। এমপি কেয়া চৌধুরীর আহ্বানে আজ সকালে বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামে আসবেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম জানান, প্রতিমন্ত্রী হবিগঞ্জে আসবেন বলে তাঁকে টেলিফোনে জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে মন্ত্রীর সফরসূচি পাঠানো হয়েছে। এদিকে সুন্দ্রাটিকির ঘটনার প্রতিবাদে হবিগঞ্জে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন। গতকাল দুপুরে হবিগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন আয়োজন করে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি হবিগঞ্জ জেলা শাখা। দুপুরে সরকারি বৃন্দাবন কলেজসংলগ্ন সড়কে তারুণ্য সোসাইটি মানববন্ধন করে।

Comments

comments