ব্রেকিং নিউজ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির অভাবে বিদেশি অপরাধীরা বেপরোয়া

illleagle-thebdexpress

দ্য বিডি এক্সপ্রে.কম।

আশংকাজনক হারে বাংলাদেশে বাড়ছে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা। এমন তথ্য জানিয়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভি গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ২১ হাজার এমন বিদেশি অবস্থান করছে। যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। গেল বছরের নভেম্বরে রাজধানীর উত্তরা থেকে আটক করা হয় ৩১ বিদেশিকে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও কয়েকদফায় মাদক ও অস্ত্রসহও কয়েক বিদেশিকে আটকের ঘটনায় ঘটে।

বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশিদের ওপর নজরদারি নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এ সুযোগে দিনে দিনে ভিনদেশি অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে, জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর অপরাধে। কিন্তু দেশে কতজন অবৈধ বিদেশি রয়েছে, সেই হিসাব নেই পুলিশের কাছে। মাঝেমধ্যে কোনো ঘটনা ঘটলে বিদেশি অপরাধীরা পুলিশের জালে আটকে পড়লেও জামিনে বেরিয়ে এসে তারা একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। অবৈধ বিদেশিরা হত্যা, ডাকাতি, প্রতারণা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িত বলে সম্প্রতি সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। এমনকি তারা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দেশে ভিনদেশি অপরাধীদের অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৬৪ জেলা পুলিশ সুপার ও সব কয়টি মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনারকে অবৈধ বিদেশিদের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ রাজধানীর কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা লুট হওয়ার ঘটনায় একাধিক বিদেশি নাগরিক জড়িত বলে পুলিশ ও র‌্যাব নিশ্চিত হয়েছে। ওই সব প্রতারককে ধরতে সব কয়টি ইমিগ্রেশন ও সীমান্ত এলাকার কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একটি সূত্র জানায়, চিঠিতে বলা হয়েছে, এক মাসের মধ্যে তালিকা সম্পন্ন করতে হবে। প্রতিটি বিদেশি নাগরিকের পাসপোর্ট দেখতে হবে। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদের ধরে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠাতে হবে। তাদের নাম ও ঠিকানা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে অবহিত করতে হবে। এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। জানা গেছে, চাকরি ও ব্যবসার কাগজপত্র নিয়ে বৈধভাবে বাংলাদেশে আসার পর অনেক বিদেশি বেছে নিয়েছে অনৈতিক সব ধরনের কাজ। আবার অনেকে অবৈধপথে বাংলাদেশে এসেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। পুলিশের কাছে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। হাতেনাতে ধরা পড়লেই কেবল তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বের ১২টি দেশের অন্তত দুই সহস্রাধিক নাগরিকের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এর মধ্যে নাইজেরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ফিলিপাইন,ভারত,আলজেরিয়া, সুদান, তানজানিয়া, উগান্ডা, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের নাগরিকের সংখ্যাই বেশি। তারা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের নেই ভিসার মেয়াদ। চেহারা ও শাররীক গঠনের মিল থাকায় অনেক ভারতীয় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছে, আবার অনেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে আসছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। কিন্তু ওই সব বিদেশি কোথায় যায়, কী করে, কোন এলাকায় বসবাস করে তার কোনো খোঁজ রাখছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এদের বড় একটি অংশই বাংলাদেশে ভয়ংকর ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ অভিজাত এলাকায় অফিস খুলে উন্নত দেশের ভিসা দেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকত্ব করিয়ে  দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি এসব বিদেশি নাগরিককে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এসব প্রতারকের খপ্পরে পড়ে অনেক ব্যবসায়ী পথে বসেছেন। এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ প্রতিদিনই জমা হচ্ছে পুলিশের কাছে। গত এক বছরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি নাগরিকদের দ্বারা প্রতারণার শিকার হয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন ছাত্র, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার অন্তত সহস্রাধিক বাংলাদেশি। আর এই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শতাধিক বিদেশিকে। তারা অল্প সময় কারাগারে থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করতে আসেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল  লতিফ। তিনি ঘানার দুই নাগরিক সুজেতা ও রুহেলার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশে তাঁর গার্মেন্টের মালামাল রপ্তানি করার কথা বলে ওই দুজন পাঁচ হাজার ডলার নিয়েছে। এরপর তারা লাপাত্তা হয়ে যায়। তারা উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে একটি বাসায় ছিল। ব্যবসায়ী আবদুল লতিফ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই দুই বিদেশির পাসপোর্টের কপি আমার কাছে রাখা ছিল। কিন্তু তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় ২০১৩ সালের জুন মাসে। ভিসার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলত দ্রুতই ভিসা হয়ে যাবে। আশুলিয়ার গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ডলার মাহমুদ ও রবিন শাহের কাছ থেকেও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ডলার হাতিয়ে নিয়েছে তারা। তারা এখনো বাংলাদেশে আছে বলে আমি জানতে পেরেছি।’ খিলগাঁও মডেল কলেজের ছাত্র এহসানুল কবির। দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক অংয়ের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তিন লাখ টাকা নেয় অং। কিন্তু টাকা নেওয়ার এক মাস পরই সে উধাও হয়ে যায়। এ ব্যাপারে খিলগাঁও থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ দনিয়ার বাসিন্দা রুহুল আমিনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। সুদানের এক নাগরিক তার কাছ থেকে ব্যবসার কথা বলে ১০০ ডলার নিয়ে চম্পট দিয়েছে। সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২০ কেজি হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয় ভারতের তামিলনাড়ুর বাসিন্দা এলাম উরুগুকে। একই সময় ঢাকার উত্তরা থেকে কোটি টাকা মূল্যের এক কেজি হেরোইনসহ পুলিশ গ্রেপ্তার করে তানজানিয়ার নাগরিক মো. রাশেদ, কঙ্গোর নাগরিক জেমস, মঙ্গোলিয়ার নাগরিক চিচিকে। তারা ভিসা ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থান করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছে। মাস খানেক কারাগারে থেকে তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। এখনো তারা বাংলাদেশে থেকে একই রকমের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে র‌্যাবের কাছে তথ্য রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ডলার জালিয়াতির অভিযোগে কেরানীগঞ্জের ডাকপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে কঙ্গোর দুই নাগরিক কামাঙ্গাবো নিবা জোসেফ ও ফাইলে ফলবো মিন্ডোলিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে গুলশানের একটি বাসা থেকে ৬০ লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন দেশের জাল ডলার উদ্ধার করা হয়। তারা অল্প কিছুদিন কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। বর্তমানে তারা খুলনা অঞ্চলে বসবাস করছে। চলতি মাসের ১৭ তারিখে গুলশান এলাকা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রের সদস্য  নাইজেরিয়ার নাগরিক ইজুচিউ ফ্রাংকিন, অবি হেছি, ইক ফ্লিস্ককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এক বছর আগেই তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, আর্থিকভাবে সচ্ছল তরুণ-তরুণীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অভিনব পন্থায় টাকা-পয়সা আত্মসাৎ করে একটি চক্র। তেমনি এক ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন চিকিৎসকের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে ব্রিটিশ নাগরিক ডেসমন্ড বি সামুয়েলের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি মিন-রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে (নম্বর-০১৭৪৭২৬৪১০১) ওই চিকিৎসককে জানানো হয়, ইংল্যান্ড থেকে তাঁর নামে একটি গিফট বক্স এসেছে। কুরিয়ার ফি দিতে হবে ৫৬ হাজার ৫৬৬ টাকা। ১১ ফেব্রুয়ারি ওই টাকা কুরিয়ারের ব্যাংক হিসাবে (নম্বর-০০১০১৭৮০৯) সোনালী ব্যাংকের উত্তরা শাখায় জমা করেন তিনি। ১৩ ফেব্রুয়ারি তাঁকে আবারও জানানো হয়, গিফট বক্স স্ক্যান করে দেখা গেছে তাতে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়না রয়েছে। তাই তাঁকে দুই লাখ ৬২ হাজার ৯০০ টাকা ফি দিতে হবে। ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি এই টাকা কুরিয়ারে ব্যাংক হিসাবে জমা করেন। ওই দিনই বিকেলে তাঁকে আবারও জানানো হয়, গিফট বক্সে অনেক মূল্যবান জিনিস থাকায় তাঁকে আরো ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। তখন তিনি গিফট বক্সের অবস্থান জানতে চাইলে পরে জানানো হবে বলা হয়। এতে ওই চিকিৎসকের সন্দেহ হলে তিনি র‌্যাবকে বিষয়টি অবহিত করেন। র‌্যাব কৌশলে সোনালী ব্যাংক উত্তরা শাখার ভেতর থেকে মোহাম্মদ আলী ও মঞ্জুর মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে তিন বিদেশিকে ধরা হয়। তাদের কাছ থেকে ৫৩ হাজার ১১ টাকা, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ক্রেডিট কার্ড ও কিছু অ্যানড্রয়েড মোবাইল সেট উদ্ধার করা হয়। এর আগেও তারা তিন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতারণা করেছিল বলে স্বীকার করে। এ দেশে তারা গার্মেন্ট ব্যবসার আড়ালে এসব অপকর্ম করে আসছিল। র‌্যাব কমান্ডার আরো বলেন, অবৈধ বিদেশিদের ধরতে র‌্যাবের অভিযান চলছে। তাদের তালিকা করার কাজও শুরু হয়েছে। গত এক বছরে দুই শতাধিক বিদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, যেসব দেশের নাগরিকদের ভিসার মেয়াদ নেই তাদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অবৈধ বিদেশিরা বাংলাদেশে থেকে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ব্যাংকের এটিএম বুথে টাকা লুটের ঘটনায় একাধিক বিদেশি জড়িত আছে। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য ইমিগ্রেশন ও সীমান্ত এলাকায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।। তিনি জানান, অবৈধ বিদেশিরা বাংলাদেশে থেকে নানা রকমের অপরাধ করছে। তাদের তালিকা করার কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি, চলতি মাসের মধ্যেই ঢাকায় কয়জন অবৈধ বিদেশি নাগরিক রয়েছে, সেই পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, অবৈধ বিদেশিরা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই আমাদের কাছে। তার পরও তাদের পাকড়াও করার অভিযান চলছে। গতকাল ঢাকাসহ সারা দেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অবৈধ বিদেশিদের তালিকা করতে।অবৈধ বিদেশিদের তালিকা করার পাশাপাশি তাদের ধরারও চেষ্টা চলছে।

Comments

comments