ব্রেকিং নিউজ

হবিগঞ্জে নিখোঁজের পাঁচ দিন পর চার স্কুল ছাত্রের লাশ উদ্ধার; পঞ্চায়েত সর্দারসহ গ্রেপ্তার ২

hobigonj-thebdexpress

দ্য বিডি এক্সপ্রেস.কম।।

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের দুই গোত্রের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। মাসখানেক আগেও আব্দুল আলী বাগাল ও আব্দাল মিয়া তালুকদারের নেতৃত্বে দুই পঞ্চায়েতের লোকজনের মধ্যে সীমানা বিরোধ এবং একটি বরইগাছ কাটা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। 

পাঁচ দিন আগে গত শুক্রবার বিকেলে তালুকদার বংশের চারটি শিশু পাশের গ্রামে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শিশুদের সন্ধান পায়নি। থানায় জিডি-মামলাও করা হয়। কেউ মুক্তিপণ দাবি করে ফোনও করেনি। শিশুদের পরিবারে কান্নাকাটি পড়ে যায়। আত্মীয়স্বজনও মুষড়ে পড়ে শোকে। অবশেষে গতকাল বুধবার সকালে শিশুদের বাড়ির পাশেই অবতারণা হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। সুন্দ্রাটিকি গ্রামের দিনমজুর কাজল মিয়া প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালেও বাড়ি থেকে বের হয়ে করাঙ্গী নদীর পাশে মাটি কাটতে যান। সকাল ৯টার দিকে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে যাওয়া কয়েকজনের জন্য দুটি শিশু নাশতা নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে শিশুরা চিৎকার করে ওঠে কার হাত দেখা যায় বলে। ছুটে আসেন কাজল মিয়া। এসে দেখেন, মাটিচাপা অবস্থায় একটি হাত ও মাথার অংশ দেখা যাচ্ছে। হালকা দুর্গন্ধও আসছে সেখান থেকে। কাজল মিয়া নিখোঁজ ওই চার শিশুর পরিবারকে দ্রুত খবর পাঠান। সবাই ছুটে আসে সেখানে। ছুটে আসে প্রশাসনের লোকজন। তারপর চাপা দেওয়া মাটির নিচ থেকে একে একে বের করা হয় ওই চার শিশুর লাশ।

ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুই বংশের বিরোধের বলি হয়েছে শিশু চারটি। এক বংশের লোকজন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই শিশুদের ধরে নিয়ে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। গতকাল সকালে লাশ পাওয়ার পর রাতে বাগাল পঞ্চায়েতের সর্দার আব্দুল আলী বাগাল (৫৫) ও তাঁর ছেলে জুয়েলকে (২৬) পুলিশ গ্রেপ্তার করে। চার শিশুর লাশ তোলার পর শুধু তাদের স্বজনরাই নয়, শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে গ্রামসুদ্ধ মানুষ। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে

 আশপাশের গ্রাম থেকেও ছুটে আসে হাজার হাজার মানুষ। করাঙ্গী নদীর পারের গ্রামটিতে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। র‌্যাব, পুলিশ, সিআইডি, ডিবি পুলিশ, জনপ্রতিনিধি আর প্রশাসনের লোকজনও সেখানে যান। তদন্তের পাশাপাশি তাঁরাও সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন শোকাহত পরিবারগুলোকে।

গ্রামবাসী জানায়, গত শুক্রবার বিকেলে বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মো. ওয়াহিদ মিয়া তালুকদারের ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), তাঁর চাচাতো ভাই আব্দুল আজিজ তালুকদারের ছেলে তাজেল মিয়া (১০) ও তালুকদার পঞ্চায়েতের সর্দার আব্দাল মিয়া তালুকদারের (৪০) ছেলে মনির মিয়া (৭) এবং তাদের প্রতিবেশী আব্দুল কাদির তালুকদারের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১০) উত্তর ভাদেশ্বর গ্রামে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। পরদিন ওয়াহিদ মিয়া শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে বাহুবল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। সোমবার বিকেলে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ শিশুদের সন্ধানদাতাকে ২০ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। মঙ্গলবার রাতে নিখোঁজ শিশু মনির মিয়ার বাবা আবদাল মিয়া বাদী হয়ে বাহুবল মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। এরপর পুলিশের একাধিক টিম ও র‌্যাব মাঠে নামে শিশুদের সন্ধানে।

গ্রামের দিনমজুর কাজল মিয়া জানান, প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে করাঙ্গী নদীর পাশে মাটি কাটতে যান। হঠাৎ করে শিশুরা চিৎকার করে বলে ওঠে, কার যেন হাত দেখা যায়। চিৎকার শুনে ছুটে যান কাজল মিয়া। গিয়ে দেখতে পান, মাটিচাপা অবস্থায় একটি হাত ও মাথা দেখা যাচ্ছে। হালকা দুর্গন্ধও আসছে সেখান থেকে। তখন কাজল মিয়া নিখোঁজ চার শিশুর পরিবারকে এই খবর পাঠান। মুহূর্তের মাঝেই খবরটি ছড়িয়ে পড়লে টেলিফোনে খবর দেওয়া হয় বাহুবল থানা পুলিশকে। সকাল ১১টার দিকে পুলিশ আসে ঘটনাস্থলে। পরে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে এসে লাশ উত্তোলনের অনুমতি দেন। তখন গ্রামের আকলিছ মিয়া, আলী হোসেন, মশাহিদ ও মানিক লাশ উত্তোলন করেন। লাশগুলো সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে পুলিশ নিয়ে যায় হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে। সেখানে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির পর নেওয়া হয় মর্গে।

গত রাত পৌনে ৭টার সময় নিহত চার শিশুর লাশের ময়নাতদন্তের কাজ শেষ হয়। গ্রামের কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোদাই করা হয়। নিহতদের অভিভাবকরা জানিয়েছেন, রাতেই জানাজা শেষে শিশুদের দাফন করা হবে।

হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. দেবাশীষ দাস জানান, চার শিশুকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। তাদের গলা টিপে শ্বাসরোধ করে মারা হয়। শ্বাসরোধ করার সময় হত্যাকারী তাদের বুকের ওপর উঠে গলায় টিপ দেয়। কয়েকজনের বুকের হাড় ভাঙা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া শিশুদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তিনি আরো জানান, শিশুদের ৭২ ঘণ্টার মাঝে হত্যা করা হয়েছে।

নিখোঁজ চার শিশুর মধ্যে তিনজনই স্থানীয় সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মধ্যে মনির মিয়া প্রথম শ্রেণিতে, জাকারিয়া আহমেদ শুভ দ্বিতীয় এবং তাজেল মিয়া চতুর্থ শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। শুভ ছিল ক্লাসের সেকেন্ড বয়। তিন ছাত্রের মৃত্যুতে স্কুলে নেমে আসে শোকের ছায়া।

স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা নুরে জান্নাত শেফা জানান, শুভ ও তাজেল ভালো ছাত্র ছিল। তারা দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও লেখাপড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ ছিল বেশি।

র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের অধিনায়ক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনির হোসেন জানান, ঘটনার মোটিভ উদ্ধারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে। যেকোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দিতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এদিকে সিলেটের অতিরিক্ত ডিআইজি ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূইয়া ও হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক নিহত চার শিশুর পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দেন। বৃহস্পতিবার তিনি এই চেক বিতরণ করবেন।

এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা : গতকাল নিখোঁজ চার শিশুর লাশ পাওয়ার খবর পাওয়া গেলে সিলেটের ডিআইজি মিজানুর রহমান পিপিএম, পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র, জেলা পরিষদ প্রশাসক ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরী, বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হাই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সিলেটের ডিআইজি মিজানুর রহমান পিপিএম এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে সন্ধান দিতে পারলে জনসমক্ষে এক লাখ টাকা পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দেন।

সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদুর রহমান মনির জানান, এখনো বলা যাচ্ছে না এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি অপহরণ। তবে পুলিশ ক্লু উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি অপহরণ তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের অবশ্যই খুঁজে আইনের আওতায় আনা হবে।

 

Comments

comments