শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার ছাত্রীটি এখন মৃত্যুর মুখোমুখি

প্রতিবেদকঃ বাগেরহাটের শরণখোলায় কলেজ শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার হয়ে এক শিক্ষার্থী এখন হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।

কলেজ শিক্ষকের এ অপকর্ম ঢাকতে ইতিমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালীদের বাধার কারণে হাসপাতালেও সঠিকভাবে চিকিৎসা নিতে পারছের না মুমূর্ষ ওই ছাত্রী। এ অভিযোগ তার পরিবারের।

এদিকে, স্থানীয় সমাজপতিরা শালিস মীমাংসার নামে ওই শিক্ষকের কাছ থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ ভাটোয়ারা করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থীর পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাজৈর এলাকায় অবস্থিত শরণখোলা ডিগ্রি কলেজের ভোকেশনালা শাখার (বি, এম) হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. মিজানুর রহমান। তিনি মোড়েলগঞ্জ উপজেলার খাউলিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আ. হালিম হাওলাদারের ছেলে।

তার কলেজের এইচ এস সি ভোকেশনাল শাখার এক ছাত্রীকে (২০) প্রাইভেট পড়ানোর সূত্রে পরিচয়ের পর ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের দারিদ্রতা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে পরবর্তীতে বিয়ের প্রলোভন দেন ওই প্রভাষক। এক পর্যায়ে স্থানীয় এক মৌলাভীর মাধ্যমে সাদা কাগজে ওই ছাত্রীর স্বাক্ষর নিয়ে কাবিননামা ছাড়াই ভুয়া বিবাহে আবদ্ধ হন তারা। পরে ওই শিক্ষার্থীকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করানোর নামে খুলনার দৌলতপুর এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ৫/৬ মাস বসবাস করেন।

এক পর্যায় ওই ছাত্রী অন্তঃসত্বা হয়ে পড়লে লম্পট শিক্ষক মিজান তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। কোনো কূল কিনারা না পেয়ে ওই শিক্ষার্থী স্ত্রীর অধিকার ও তার গর্ভে থাকা অনাগত সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের দাবিতে সম্প্রতি বাগেরহাট আদালতে একটি মামলাসহ কলেজ অধ্যক্ষের নিকট মিজানের বিরুদ্ধে একটি আবেদন করেন।

এ ঘটনার পর স্থানীয় সমাজপতিরা প্রভাষক মিজানুর রহমানের পক্ষে জোর তদবির শুরু করে। তারা ওই শিক্ষার্থীকে বৈধ স্ত্রীর মর্যাদার আশ্বাস দিয়ে মামলা প্রত্যাহারসহ তার গর্ভে থাকা সন্তান নষ্টের জন্য চাপ প্রয়োগ করে।

পরবর্তীতে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালীর নেতৃত্বে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ওই ছাত্রীর গর্ভের সন্তান মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ স্বাস্থ্য সহকারী ডা. আ. করিম ও সিনিয়র স্টাফ নার্স সরজু রানী হালদারের সহায়তায় নষ্ট করা হয়। পরে ওই ছাত্রীর ভবিষ্যতের কথা বলে সমাজপতিরা শালিস মীমাংসার নামে প্রভাষক মিজানুরের কাছ থেকে নগদ দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নেন। সেই টাকা তারা ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েটির পরিবারকে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় গোলবুনিয়া এলাকার বাসীন্দা মো. ওহিদুল তালুকদারের কাছে জমা করেন। এ সময় ওই ছাত্রীর নিকট থেকে স্ট্যাম্প ও সাদা কাগজে কয়েকটি স্বাক্ষর গ্রহণ করেন শালিস কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে, ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে কলেজ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় প্রভাষক মিজান তার মুঠোফোনটি এক আত্মীয়ের কাছে রেখে গা ঢাকা দেয়।

হাসপাতালে ওই ছাত্রীর বড় বোনের স্বামী মো. কবির হাওলাদার জানান, তার শ্যালিকার নামে স্থানীয় সমাজপতিরা দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা ধার্য্য করে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. নাসিম তালুকদার বলেন, ‘অসহায় এ মেয়েটির বাবা একজন পেশাজীবী। তিনি সুন্দরবনে চড়গড়ার মাধ্যমে (জাল ফেলে) সংসার নির্বাহ করেন। কিন্তু লম্পট শিক্ষক মিজানের কারণে তার সংসারে নানা অশান্তি শুরু হয়েছে।’

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে শরণখোলা ডিগ্রি কলেজের এক সহকারী অধ্যাপক বলেন, ‘লম্পট মিজানের কারণে গোটা কলেজের বদনাম হয়েছে। তার এমন কর্মকাণ্ডের কারণে এখন অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের কলেজে ভর্তি করাতে ভয় পাচ্ছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ মিজানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায়, বিষয়টি নিয়ে মামলা পর্যন্ত হয়েছে।’

এ বিষয়ে শরনখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. অসীম কুমার সমদ্দার জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণজনিত কারণে ওই মেয়েটি তার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার অবস্থার অবনতি হলে ২০ ফেব্রুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই ছাত্রীর গর্ভের সন্তান নষ্টের সঙ্গে তার হাসপাতালের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বিধিগত ব্যাবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে, অভিযুক্ত ডাক্তার ও নার্স টাকার বিনিময় ওই ছাত্রীর গর্ভের সন্তান নষ্টের কথা অস্বীকার করেছেন। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত প্রভাষক মিজানুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার এক নিকট আত্মীয় বলেন, ‘স্থানীয় সালিশ ব্যবস্থায় ওই ছাত্রীর পক্ষে যাকে মানা হয়েছে, আমরা তার কাছে ক্ষতিপূরণের নগদ দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি। সে টাকা ওই মেয়েটির পরিবার না পেলে আমরা দায়ি হব কেনো?’

এ বিষয়ে শরণখোলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. নুরুল আলম ফকির জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। তা ছাড়া মুঠোফোনে তিনি কোনো বক্তব্য দেবেন না বলে জানান।

শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রেজাউল করিম জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

Comments

comments