ব্রেকিং নিউজ

স্বমহিম নজরুল

Kazi-Nazrul-Islamএইচ এম সিরাজ

 সাম্য-প্রেম-মানবতা-অসাম্প্রদায়িকতা-স্বাধীনতা ও ‘মানুষ’-এর শ্রেষ্ঠতম কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তাঁর চেতনা ও ভাবমর্যাদা বিকশিত, সুরক্ষিত হয়নি বহুলাংশে অসঙ্গত নানা কারণে। অথচ তা সঙ্গত কারণে সুরক্ষা ও বিকাশ চেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন স্বদেশে ফেরার মাত্র সাড়ে চার মাসের মধ্যে (১৯৭২ সালের ২৪ মে) এই মহান কবিকে এ দেশে নিয়ে আসেন। আর সে সুবাদে পশ্চিমবঙ্গের কাজী ফকীর আহমদের পুত্র বিদ্রোহীকবি কাজী নজরুল ইসলামকে ‘বাংলাদেশের জাতীয় কবি’ হিসেবে আমরা পাই। এবং তারই ধারাবাহিকতায় কবির একান্ত ব্যক্তিগত অভিলাষ ‘মসজিদের পাশে আমার কবর দিও ভাই’ যথার্থই প্রতিষ্ঠা পায়।

সমকালীন বিশ্বের সম্ভবত একমাত্র অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী “সম্পূর্ণ মানুষ” কবি নজরুল ইসলাম বিশেষ করে তাঁর কাব্য-সাহিত্যের ছত্রে-ছত্রে দার্শনিকতার পরিস্ফুটন ঘটিয়েছেন বিস্ময়করভাবে। এবং সে সবের মাহাত্ম্য দিনে দিনে স্পষ্টরূপে প্রকাশিত হচ্ছে। আজকে তাই মোবাইল ফোন দেখিয়ে অনেকেই নজরুলের ‘সংকল্প’ কবিতার উদ্বৃতি দেন— ‘বিশ্বজগৎ দেখব এবার আপন হাতের মুঠোয় পুরে।’ আবার কেউবা ‘জীবন বন্দনা’ কবিতা থেকে বলেন— ‘নবীন জগৎ সন্ধানে যারা ছুটে মেরু অভিযানে/পক্ষ বাধিয়া উড়িয়া চলেছে যাহা ঊর্ধ্বপানে/তবুও থামে না যৌবনবেগ জীবনের উল্লাসে;/ চলছে চন্দ্রে, মঙ্গলগ্রহে, স্বর্গে-অসীমাকাশে।’ কী বিস্ময়কর! কীভাবে দেখলেন নজরুল এ সব? অবাক করার বিষয়— নজরুল ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় আমাদের সতর্কতার জন্য বলেছেন, ‘বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই নবী’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশাল চিত্তগুণে কবি নজরুলকে চিনেছিলেন বলেই আপন উদ্যোগে তাঁকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন বাংলাদেশে এনে যথাযথ মর্যাদায় সমাসীন করেন। ফলে ইতিহাস-নির্ণীত পথে নজরুল আমাদের ‘জাতীয় কবি’ স্বীকৃতি পান। যদিও এ বিষয়ে আজও জাতীয় সংসদে আইন (জাতীয় কবি বিল) পাস হয়নি। প্রসঙ্গত, এর বহু পূর্বে (১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর) বেশ কিছু বাঙ্গালী মহান মানুষের বিচক্ষণ উদ্যোগে ত্রিশ বছরের যুবক নজরুলকে কলকাতার এ্যালবার্ট হলে সাড়ম্বর সংবর্ধনা দেওয়া হয় ‘বাঙ্গালী জাতির জাতীয় কবি’ অভিধায়। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মহানপুরুষ নেতাজী সুভাষ বসু বলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাব— তখনও যেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাব সেখানেও তার গান গাইব।… নজরুল যে স্বপ্ন দেখেছেন, সেটা শুধু তাঁর নিজের নয়, সমগ্র বাঙ্গালী জাতির।’

বিজ্ঞানাচার্য্য স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে নেতাজী আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, ‘রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি ভারতের সর্বত্র ঘুরে বেড়াই এবং সেই সুবাদে বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষায় রচিত জাতীয় সঙ্গীত শোনার সৌভাগ্য আমরা হয়েছে। তবে নজরুলের “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” গানটির মতো মন মাতানো সঙ্গীত আর কোথাও শুনি নাই।’

১৯৭২ সালের ২৫ মে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নজরুল জন্মজয়ন্ত্রী উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সে বাণী দেন, ইতিহাসের বিচারে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রদত্ত বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙ্গালীর বিদ্রোহী আত্মা ও বাঙ্গালীর স্বাধীন ঐতিহাসিক সত্তার রূপকার। বাংলার শেষ রাতের ঘনান্ধকারে নিশীথ নিশ্চিত, নিদ্রায় বিপ্লবের রক্তলীলার মধ্যে বাংলার তরুণরা শুনেছে রুদ্র-বিধাতার অট্টহাসি, কাল ভৈরবের ভয়াল গর্জন নজরুলের জীবনে, কাব্যে, সঙ্গীতে ও তাঁর কণ্ঠে। প্রচণ্ড সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো, লেলিহান অগ্নিশিখার মতো, পরাধীন জাতির তিমির ঘন-অন্ধকারে বিশ্ববিধাতা নজরুলকে এক স্বতন্ত্র ছাঁচে গড়ে পাঠিয়েছিলেন এই ধরার ধুলায়।’

আর একজন মহৎপ্রাণ বাঙ্গালী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুল নামের দুরন্ত ছেলেটাকে চিনেছিলেন গভীর ধেয়ানে ও কায়মনে। তাই তেইশ বছরের যুবক নজরুল “ধূমকেতু” নামে অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নিলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “ধূমকেতু” নামকরণের কারণ জানতে চান। নজরুল তখন লাফিয়ে উঠে আবৃতি করেন, আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃমহাবিপ্লব হেতু;/ এই স্রষ্টার শনি-মহাকাল ধূমকেতু। … রবি ঠাকুরের আর বুঝতে বাকী থাকে না। তিনি আশীর্ব্বাদ বাণী দেন—

“আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
-আঁধারে বাঁধ্ অগ্নিসেতু,
——দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
—উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন।
অলক্ষণের তিলক-রেখা
—রাতের ভালে হোক-না লেখা—
——জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
———-আছে যারা অর্ধচেতন।”

বোধ করি এই-ই প্রথম কবি রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে বিদ্রোহের বাণী শোনা গেল; এবং তা যেন অবিকল নজরুল-কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। এখানে আমার মনে হয়েছে, নজরুলের ধূমকেতু-রূপের মাহাত্ম্য তাৎক্ষণিক হৃদয়াঙ্গম করতে পেরেই উপর্যুক্ত আশীর্বাণী দেন বিশ্বকবি ররি ঠাকুর। আন্দাজ করা যায়, সে দিন সেই ক্ষণে ‘গুরুদেব’ রবীন্দ্রনাথ অলক্ষ্যে ও অকস্মাৎ ‘নজরুল’ হয়ে উঠেছিলেন। বিষয়টি স্পষ্ট করতে “ধূমকেতু” কবিতার কয়েকটি চরণ এখানে উদ্ধৃত করছি :

“আমি সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁ বোঁ ঘুড়ি শূন্যে
আমি বিষধুম-বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান অভিমুন্যে।
এই শিখায় আমর নিযুত ত্রিশূল, বাসুলি বজ্রছড়ি
ওরে, ছড়ানো রয়েছে, কত যায় গড়াগড়ি;
মহা-সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্বসম্রাট নিরবধি
তাঁর ললাটে তপ্ত অভিশাপ-ছাপ এঁকে দিই আমি যদি!
তাই, টিটকিরি দিয়ে হাঁ হাঁ হেসে উঠি
সে হাসি গুমরে লুটিয়ে পড়ে রে তুফান-ঝঞ্ঝা-সাইক্লোন টুটি”

এমনি আরও বহু দুঃসাহসিক বাণীর গাঁথুনী দিয়ে রচিত “ধূমকেতু” কবিতা ‘বিদ্রোহী’র চেয়েও বেশী-বিদ্রোহী বলে আমার মনে হয়েছে। ফলে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনায়াশেই বুঝেছিলেন সে মাহাত্ম্য এবং নজরুলকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন, “উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন” বলে।

বাঙ্গালী জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কবি নজরুলের বিদ্রোহী-চেতনার রাজনৈতিক-প্রতিভূ। তাই তিনি অকপটে জনসভায় দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, ‘আমার চারপাশে চোর ও চাটার দল, মানুষ সোনার খনি পায়, আমি পেয়েছি চোরের খনি; ওরা আমার কম্বলটিও চুরি করতে ছাড়েনি। বিশ্বের মানুষ আজকে দুই ভাগে বিভক্ত শোষক এবং শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।’

এ ছাড়াও আরও বড় উদাহরণ হচ্ছে— ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব; তবু এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা’

শেখ মুজিবের এ ঐতিহাসিক ভাষণের মূল রূপকার কবি নজরুল। ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ শীর্ষক কবিতায় নজরুল বাঙ্গালীর স্বাধীনতার রূপকল্প তুলে ধরেন পরিষ্কাভাবে :

“কাণ্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর
বাঙ্গালীর খুনে লাল হলো যেথা ক্লাইভের খঞ্জর
ঐ গঙ্গারয় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর
উঁদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।”

সুতরাং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বয়সকাল ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত; অর্থাৎ ২১৪ বছর। তবে, ‘৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ’ তার-ই মৌলিক অধ্যায়।

 

Comments

comments