ব্রেকিং নিউজ

গান্ধীজির হত্যাকারীরা এখন দিলি্লর মসনদে– বদরুদ্দিন উমর

Bodruddin-Omarবিডি এক্সপ্রেসঃ২৪, ডিসেম্বর গান্ধীজির হত্যাকারীরা এখন দিলি্লর মসনদে। তার হত্যাকারী নাথুরাম বিনায়ক গডসের দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের শাসক শ্রেণীর রাজনীতির কলকাঠি নাড়ছে। তারা আর অন্তরালেও নেই। একেবারে সামনে এসে তারা ঘোষণা করছে, ভারত এখন হিন্দু রাষ্ট্র! পশ্চিমবঙ্গে এতদিন পর্যন্ত বিজেপির কোনো জায়গা ছিল না; কিন্তু কেন্দ্রে তারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর সেখানে তাদের একটা অবস্থান তৈরির পরিপ্রেক্ষিতে আরএসএসের এই আজ্ঞাবাহী দলটির সহযোগী দল বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কলকাতায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে এখন খোলাখুলিভাবে ভারতকে একটি 'হিন্দু রাষ্ট্র' হিসেবে ঘোষণা করেছে! তারা বলেছে, ৮০০ বছর পর হিন্দুরা এখন আবার দিলি্লতে তাদের সাম্রাজ্য ফিরে পেয়েছে! বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রভাবশালী সমর্থক অশোক সিংঘাল কলকাতায় একটি গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসবে বলেছেন, 'আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মকে অধীন করা হয়েছিল এবং ৮০০ বছর ধরে আমরা সংগ্রাম করেছি। ৮০০ বছর পর এখন সময় এসেছে যখন আমরা বলতে পারি যে, আমরা একটা সরকার পেয়েছি, যা হিন্দুত্বকে রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর। আমাদের মূল্যবোধ এখন দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে।' বিজেপি সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, 'দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহান তা হারানের পর দিলি্লতে হিন্দুরা ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। এর আগে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবৎ বলেন, 'ভারত এখন একটি হিন্দু রাষ্ট্র।' পশ্চিমবঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সর্বপ্রথম এই সম্মেলনে তিনি বলেন, 'এটা আমাদের নিজেদের দেশ। অতীতে আমরা যা হারিয়েছি, সেটা এখন আমাদের চেষ্টা করতে হবে তা ফিরিয়ে আনতে। এই হিন্দু অভ্যুত্থানে কারও ভয়ের কিছু নেই। যারা হিন্দুদের এই উত্থানের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে তারা স্বার্থপর এবং তাদের কায়েমি স্বার্থ আছে। তারা যদি বিরোধিতা করে, তাহলে তাদের মোকাবেলা করা হবে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যে অপরাধ করা হয়ে এসেছে আমরা তা এতদিন সহ্য করে এসেছি। আমাদের ঈশ্বর বলেছেন, 'একশ' অপরাধের পর তোমরা কোনো অপরাধ আর সহ্য করো না' (ডেইলি স্টার)। ভারতের রাজ্যসভায় এই 'গৃহে প্রত্যাবর্তনের' যে বিরোধিতা করা হয়েছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই এসব কথা বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, কয়েকদিন আগে ভারতে তাদের 'গৃহ প্রত্যাবর্তন' কর্মসূচি অনুযায়ী ধর্মান্তকরণের যে কর্মসূচি কার্যকর করা শুরু হয়েছে তার বিরুদ্ধে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চসভায় তুমুল হৈ-হট্টগোল হয়েছিল। কয়েকদিন আগে আগ্রায় ৫০ জন মুসলমানকে জোরপূর্বক হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করার বিরুদ্ধে সেই প্রতিবাদ হয়েছিল। তার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটে ২০ ডিসেম্বর ২০০ খ্রিস্টানকে একইভাবে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। বিভিন্ন খ্রিস্টান মহল থেকে আরএসএস কর্তৃক এভাবে ধর্মান্তকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। বিরোধী কংগ্রেস নেতা দিগ্গি্বজয় সিংহ বলেছেন, 'হিন্দুত্বের মাধ্যমে আরএসএস তাদের পেশিশক্তি প্রদর্শন করছে।' হাস্যকর ব্যাপার এই যে, আরএসএসের এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং আরএসএসের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে জোরপূর্বক কোনো ধর্মান্তকরণ করা না হয়!

নরেন্দ্র মোদি চক্রান্তেই হিন্দু রাষ্ট্রের ঘোষণা এবং ধর্মান্তকরণ কর্মসূচি শুরু হলেও কৌশলগত কারণে তিনি নিজে এভাবে কিছু বলেননি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। যদিও তিনি গীতাকে ভারতের জাতীয় ধর্মগ্রন্থ হিসেবে কয়েকদিন আগে ঘোষণা করেছেন! কংগ্রেসের আমলে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার শক্তি বৃদ্ধি পেলেও তা এতদিন ছিল অন্তরালে। এখন বিজেপির আমলে তা সরাসরি ও খোলাখুলিভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
পাকিস্তান প্রথম থেকেই নিজেকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং সেখানে ব্লাসফেমি আইন বলবৎ করা হয়েছে। ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের তারা নিয়মিতভাবে মদদ দিয়েও এসেছে। যার ফলভোগ তারা এখন করছে। এর উদাহরণ হলো, পেশোয়ারের একটি স্কুলে জঙ্গিদের দ্বারা ১৩২টি শিশুসহ প্রায় দেড়শ'জনের হত্যা। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাদের টনক নড়েছে এবং দেরিতে হলেও তারা ইসলামী জঙ্গি শক্তি তালেবানদের বিরুদ্ধে জোরেশোরে যুদ্ধে নেমেছে। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার শক্তি পাকিস্তান আমলে দুর্বল হতে হতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার ভিত্তি অপসারিত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের নব্য শাসক শ্রেণী জনগণের শোষণ-নির্যাতন হিসেবে ধর্মের ব্যবহার প্রয়োজনবোধ করায় প্রথম থেকেই তা কৌশলের সঙ্গে শুরু হয়েছিল। এর পরিণতিতেই এরশাদের সময় সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের 'রাষ্ট্রধর্ম' ঘোষণা করা হয়েছিল। এটা শুধু এরশাদের ব্যাপার ছিল না। তা যে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীরই কীর্তি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তার প্রমাণ এরশাদের পর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের 'গণতান্ত্রিক' সরকার বারবার ক্ষমতায় এলেও তারা কেউই এরশাদের সেই গণবিরোধী সংশোধনী বাতিল করার কোনো কথা বলেনি, কোনো চেষ্টা তারা করেনি, যদিও এই উভয় রাজনৈতিক দলই জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ বা তার থেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সহজেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিষয়ক সাংবিধানিক সংশোধনী বাতিল করার মতো ক্ষমতার অধিকারী ছিল।
এখানে উল্লেখযোগ্য, কলকাতার বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সম্মেলনে আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবৎ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়কেই একইভাবে দোষারোপ করলেও বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী কর্তৃক ধর্মের ব্যবহার সত্ত্বেও জোর দিয়ে বলা যায় যে, বাংলাদেশের জনগণ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। একমাত্র এ দেশের জনগণই পাকিস্তান আমলে খোলাখুলি সক্রিয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করেছিলেন, একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছিলেন। সেই যুদ্ধ ও সংগ্রামের ফলে শাসক শ্রেণীর আদর্শগত উল্টোযাত্রা এবং দুর্নীতি সত্ত্বেও সমগ্র উপমহাদেশে এখানকার জনগণই রাজনৈতিক দিক ও সামাজিক দিক দিয়ে সব থেকে বেশি ধর্ম বিযুক্ত (ংবপঁষধৎ)। এ ক্ষেত্রে এখানকার শাসক শ্রেণী ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে কলঙ্কজনক ভূমিকা রেখেছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই।

 
 

Comments

comments