ব্রেকিং নিউজ

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কমছে না তেলের দাম

1_191409বিডি এক্সপ্রেসঃ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে কমলেও এর সুফল পাচ্ছেন না দেশের ভোক্তারা। যদিও এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে পাঁচ দফা বাড়ানো  হয়েছিল এই তেলের দাম। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বেশি হওয়ায় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে বিদ্যুৎ, পানিসহ সেবা খাতের বিলও। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ তো রয়েছেই। এতে ভোক্তাদের যেমন দুর্ভোগ কমছে না, তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশীয় পণ্য মূল্যের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম কমানো জরুরি বলে অভিমত দিয়েছেন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গত ৫ বছরে চার দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল। অথচ বিশ্ববাজারে সেই অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে কমতে সর্বনিুের রেকর্ড গড়লেও গত ৬ মাসে সরকার এক টাকাও কমায়নি। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫৬ দশমিক ৬৭ ডলারে। যা গত ৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর আগে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে জ্বালানি তেলের দাম নেমে গিয়েছিল ৬০ ডলারে। এরপর ২০১১ সালের এপ্রিলে তেলের দাম সর্বোচ্চ বেড়ে হয় ১২৫ মার্কিন ডলার। ধারবাহিক উত্থান-পতনের পর চলতি বছরের জুন থেকে টানা দরপতন শুরু হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত জুন থেকে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪৮ শতাংশ কমেছে। খোদ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমায় গত অক্টোবর থেকে বিপিসি লাভের ধারায় ফিরেছে। এ কারণে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া ভর্তুকিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তার মতে এভাবে ৬-৭ মাস চলতে থাকলে বিপিসি অতীতের সব দায় দেনা-পরিশোধ করে লাভ করতে পারবে। তবে তেলের দাম কমানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা সম্পূর্ণ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।বিশ্লেষকদের বক্তব্য জ্বালানি তেলের দাম কমানো নিয়ে সরকার জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, ইতিমধ্যে ভারতসহ অনেক দেশে তেলের দাম অনেক কমানো হলেও আমাদের সরকার নিশ্চুপ। গত মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম আড়াই টাকা পর্যন্ত কমিয়েছে ভারত। সর্বশেষ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। সেবার পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটার প্রতি ৫ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি বাড়ানো হয়েছিল ৭ টাকা করে। ওই সময় সরকার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম কমলে স্থানীয় পর্যায়েও দাম সমন্বয় করা হবে। কিন্তু সরকার তার সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে।তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যে হারে কমেছে তাতে সরকারের এই মুহূর্তে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪ টাকা কমানো উচিত। তিনি বলেন, তেলের দাম না কমিয়ে সরকার ইতিমধ্যে তার প্রতিশ্র“তি ও অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। তার মতে মূলত তেল চুরি, দুর্নীতি আর লুটপাটের জন্যই সরকার ইচ্ছা করেই তেলের দাম কমাচ্ছে না। তিনি পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেন, গত জুন মাস থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করলেও বিপিসি বলছে তারা অক্টোবর থেকে কম দামের তেল পেতে শুরু করেছে। তার মতে, এ ৫ মাসের তেল ক্রয় নিয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, এর আগে সরকার যুক্তি দেখিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তেল আমদানিকারক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসির লোকসান বাড়ছে। ফলে কয়েক দফায় তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তখন প্রতিটি পেট্রলপাম্পে একটি তালিকা ঝুলিয়ে রাখা হতো। সরকার কোন কোন খাতে কত টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে, তাতে উল্লেখ ছিল ওই তালিকায়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার ধারা বন্ধ হয়েছে বেশ আগেই। ইতিমধ্যে সরকার তেলের জন্য ভুর্তকি দেয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু ৬ মাসে তেলের দাম কমেছে ৪৮ শতাংশের উপরে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন জ্বালানি তেলের দাম পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রয়েছে। তারপরও সরকার তেলের দাম না কমানোর রহস্যজনক। তিনি অবিলম্বে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম সমন্বয় করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেশের বাজারে যখন তেলের দাম বাড়ানো হয়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ১ ব্যারেল তেলের দাম ছিল ১২২ ডলার। ওই সময় সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল তেলের দাম অর্ধেকে নেমে আসে। অথচ দাম কমানো নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের মধ্যে কোনো ধরনের টু শব্দ নেই। উল্টো দেশের স্থানীয় বাজারে (গ্রাম পর্যায়ে) ডিজেল ও কেরোসিনের দাম সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি বিক্রি করা হচ্ছে।বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবিব লাবলু বলেন, জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কথা বলে সরকার বিদ্যুতের দামও বাড়িয়েছে একাধিকবার। এখনও একই খোঁড়া যুক্তি অর্থাৎ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা বলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, সরকারের এ যুক্তি কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। কারণ বিশ্ববাজারে তেলের দাম ক্রমেই কমছে। অথচ একই কারণ দেখিয়ে সরকার বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের খরচ বেড়ে গিয়ে কার্যত বোঝাটা পড়ছে ভোক্তাদের ওপরই। তিনি বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে অবিলম্বে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে বিশ্লেষকরা বলছেন সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে তেলের উৎপাদন বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে ওপেকভুক্ত দেশগুলোতে ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রেও তেল উৎপাদন বেড়েছে। অন্যদিকে জাপান, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের অর্থনীতির ধীর প্রবৃদ্ধি। ফলে আইইএ বলছে, বিশ্বে তেলের চাহিদা কমবে। অর্থাৎ চাহিদা এবং সরবরাহ দুই দিকের চাপে দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) চলতি বছরের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তেলের রফতানি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব।জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্ববাজারের তুলনায় আমাদের খুচরা বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম। কারণ সরকারকে প্রতিবছর এই খাতে অনেক টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। ফলে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে দাম কমানোর যৌক্তিকতা নেই। বর্তমানে দেশে কেরোসিন ৬৮, পেট্রল ৯৬ ও অকটেন ৯৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।বিপিসি চেয়ারম্যান ইউনুসুর রহমান বলেন, চলতি বছরের জুন থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকলেও আর্থিক সংকট ও গোডাউনের অভাবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ মাস কম দামে তেল ক্রয় করতে পারেননি। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে যে পরিমাণ তেল ক্রয় শুরু হয়েছে তা অক্টোবরের শেষদিক থেকে কম দামে বিক্রি করতে পারছেন। এতে লিটারপ্রতি ডিজেলে ২-৩ টাকা লাভ থাকছে বিপিসির। ৪ মাস কম দামে তেল ক্রয় করতে না পারায় কি পরিমাণ অর্থ গচ্চা গেছে এই প্রশ্নের উত্তরে চেয়ারম্যান বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বছরে গড়ে দেড়শ’ থেকে ২শ’ জাহাজ তেল আমদানি করতে হয় বিপিসিকে। প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জাহাজ তেল আমদানি হয়। এই হিসাবে চার মাসে কম মূল্যে ১০০ জাহাজ তেল আনতে পারেনি। এর পরিমাণ প্রায় ২০ লাখ মে. টন। বর্তমানে দেশে বছরে তেলের চাহিদা ৫৮ লাখ মে. টন।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকার পরও বেশি দামে তেল ক্রয় করায় বিপিসিকে ওই সময়ে কমপক্ষে ২২শ’ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে।বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪-৫টি দেশের সঙ্গে তেল ক্রয়ের চুক্তি আছে। এর মধ্যে কুয়েত, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া অন্যতম। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর গিয়ে আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করেছে বিপিসি।

Comments

comments