ব্রেকিং নিউজ

প্রলয়ঙ্করী সিডর আজও ভুলতে পারেনি উপকূলবাসী

vongfong-viirs-irবিডি এক্সপ্রেসঃ আজ ভয়াল ১৫ নভেম্বর। ২০০৭ সালের এই দিনে উপকূল দিয়ে বয়ে যায় স্মরণকালের ভয়ংকর ঘুর্ণিঝড় সিডর। যা আজও ভুলতে পারেনি পাথরঘাটাসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষ।
ভয়াংকর সাইক্লোন সিডরের কথা লিখে বোঝান যাবে না বা বোঝার মত কোনো ভাষাও নেই। দুঃসহ স্মৃতি আর চরম এক হতাশা দুর্বিসহ যন্ত্রনা এখনও কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে স্বজনহারা বেচে থাকা দুর্গতদের। অপরদিকে জীবিকার তাগিদে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা অনেকেই ফিরে আসতে পারেনি স্বজনদের কাছে। অনেকে চলে গেছে সাগরের অথৈ তলদেশে, আবার অনেকে মাছের পেটে। অনেকে ভাসতে ভাসতে পাশ্ববর্তী মিয়ানমার কিংবা ভারতে চলে গেছে কেউ মৃতূ্য বা কেউ জীবিত। আজ ওইসব নিহত এবং নিখোঁজ স্বজনদের স্বরণে শুধু চোখের পানি এবং রুহের মাগফেরাত কামনা ছাড়া কিছুই যে তাদের করার নেই; সন্তান হারা পিতা-মাতা, পিতা-মাতা হারা সন্তানরা এখনও পথের দিকে তাকিয়ে আছে হয়তবা আবার আসবে এ আশায়।
যেভাবে হয়েছিল সিডরঃ ১৪ নভেম্বর দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ৮ টা থেকে সাড়ে ৮টা। কোনো কিছু বোঝার আগেই হঠাৎ করে শুরু হয়ে গেল ঘুর্ণিঝড়। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি এত বড় ভয়ংকর সিডর এসে তাদের সব কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। নিয়ে যাবে তাদের স্বজনদের। পিতার চোখের সামনে সন্তানের মৃতূ্য, সন্তানের চোখের সামনে পিতা-মাতার মৃতূ্য দেখতে হয়েছিল সেদিন। ওইদিন সব লন্ডভন্ড করে দেয় গোটা পাথরঘাটার রাস্তাঘাট, পুল-ব্রীজ, ঘরবাড়ি, গৃহস্থালি, গাছপালা, হাঁস-মুরগী, স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসা। অসহায়ের মত শুধু চোখ দিয়ে দেখেছে, কিন্তু প্রতিরোধ করার মতো কিছুই তাদের ছিল না। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। নিমিষেই নিশ্চিহৃ করে দিয়ে গেছে চোখরুপি ভয়ংকর সাইক্লোন সিডর। স্বজন হারানো ব্যাথা নিয়ে দিন যাপন করতে হয় তাদের। স্বজন হারানোর বেদনা যেন তাদের ঠুকরে ঠুকরে মারছে। এ প্রতিবেদনটি লিখতে গিয়ে নিজেই চোখের পানি রাখতে পারছিলাম না। এ যেন লোমহর্ষক কাহিনী। যা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। সিডরের রাতে কথা মনে উঠলে গা শিওরে ওঠে। গতকাল বুধবার গিয়েছিলাম পাথরঘাটার সদর পাথরঘাটা ইউনিয়নের পদ্মা গ্রামে। যে গ্রামটির কথা ভোলার মত নয়। এই পদ্মা গ্রামের ভেরীবাধটি ভেঙ্গে সিডরের স্রোত ঢুকে কয়েকশ বাড়ি-ঘর, মানুষসহ প্রাণী জগত সব কিছু নিয়ে গিয়েছিল ওই অথৈ সাগরে। যার কোন কিনারা নেই। যারা পানির স্রোতের মধ্যে পড়েছে তাদের আজও খুজে পাওয়া যায়নি। অনেকের লাশ পাওয়া গেছে নদীর পাড়ের বালু এবং মাটির মধ্যে।
আগাম কোনো সতর্কতা ছিলনাঃ দক্ষিনাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া চোখরুপি ভয়ংকর সিডর এর সময় রেডক্রিসেন্ট কিংবা আবহাওয়া অফিস থেকে আগাম কোনো সতর্কতা ছিলনা। আগাম সতর্কবানী না থাকায় এসব এলাকার মানুষ নিরাপদ আশ্রয় যেতে পারেনি। ফলে সিডরের পানির স্রোতে অনেক মানুষ ভেসে গেছে। অনেকের লাশ পাওয়া গেছে ধান ক্ষেতে, গাছের মাথায় আবার অনেকের লাশ আজও পাওয়া যায়নি।
সিডরে নির্খোজ এবং মৃত্যের সংখ্যা ঃ সিডরে কি পরিমাণ মানুষ নিখোঁজ এবং নিহত হয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান আজও পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে সরকারি হিসেবে ৭/১২/০৭ তারিখের পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা ৩৪৯ জন এবং নিখোঁজের সংখ্যা ১৪৮জন কিন্তু বেসরকারি হিসাবে তার চেয়ে অনেক বেশী। শুধু কাকচিড়ার ইটভাটার চুঙ্গার ভিতরে ২৯ জনের লাশ পাওয়া গিয়েছিল। বেসরকারী একটি পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সিডরের নিহতের পরিমাণ প্রায় হাজারের উপরে।
দক্ষিনাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ঃ ঘূর্ণিঝড় সিডরে পাথরঘাটা-ঢাকা মহাসড়কের দুপাশের গাছ পরায় দেশের দক্ষিনাঞ্চলের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল প্রায় দেড় মাস। এর পাশাপাশি বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল একমাস।
বেড়িবাঁধ ঃ ঘূর্ণিঝড় সিডরে পাথরঘাটায় ৪০/১ পোল্ডারের ২৩ কিলোমিটার এবং ৪০/২ পোল্ডারের ৩৫ কিলোমিটার বাধ সম্পুর্ণ ভেঙ্গে গেছে। সিডরের ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মেরামত হয়নি ওইসব ক্ষতিগ্রস্থ বাধ। পাথরঘাটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসও সামসুল হক জানান, ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাধের জন্য সরকার থেকে মাত্র ১ কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ বাধ মেরামত করতে হলে ৫০ কোটির টাকার বেশী দরকার।
ফিসিং ট্রলার ঃ ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় সাগরে মাছ ধরারত অবস্থায় ৩৭৫টি ফিসিং ট্রলার নিখোঁজ হয়েছে এবং ২৮০টি ট্রলার ভেরীবাধের বিভিন্ন জায়গায় উঠে থাকে। নিখোঁজ ট্রলারের মধ্যে কিছু পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি। সিডরের সময় নিখোঁজ হওয়া পাথরঘাটার শতাধিক জেলে এখনও ভারতের কারাগারে আটক রয়েছে। ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, আজ ১৫ নভেম্বর শুক্রবার জেলেদের প্রতি ঘরে ঘরে এবং এলাকার বিভিন্ন মসজিদে এবং বিএফডিসিতে সিডরে নিহত স্বজনদের স্মরণে কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছেন। জেলে সমপ্রদায় এবং উপকূলবাসীর দাবি ১৫ নভেম্বর প্রতি বছর এই দিনে যেন সরকারি ভাবে সিডর দিবস পালিত হয়।

Comments

comments